আপিল বিভাগ
‘পছন্দমতো’ না মেলায় নিয়োগ হচ্ছে না বিচারক
- হাইকোর্টে প্রথম ৫২ জনের ৫১ জন আওয়ামী আমলে নিয়োগ পাওয়া
- অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পেয়েছেন ৪৮, স্থায়ী হননি এখনো ২৬ জন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সংকট থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নতুন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না দীর্ঘদিন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পছন্দমতো বিচারক মিলছে না বলে আটকে আছে নিয়োগ। ফলে সর্বোচ্চ আদালতে বাড়ছে মামলার জট।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত, তথা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বর্তমানে প্রধান বিচারপতিসহ বিচারক আছেন চারজন। ১৯৭২ সালে দেশের আদালতের যাত্রাকালে আপিল বিভাগে বিচারক ছিলেন তিনজন। ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারক ছিলেন। এর আগে-পরে বিচারকের সংখ্যা কমেছে, আবার বেড়েছে।
তবে বিচারকের সংখ্যা কমবেশি হলেও মামলার সংখ্যা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ধারাবাহিক বেড়েছে। ১৯৭২ সালে আপিল বিভাগে মামলার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৬টি। সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪১ হাজার ৫৫১টি।
বাংলাদেশে সাধারণত হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত বিচারপতিদের মধ্য থেকেই আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে সাধারণত সিনিয়র বিচারকরাই প্রাধান্য পেয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে হাইকোর্টে সিনিয়র বিচারপতি হিসেবে যারা আছেন, তাদের বেশিরভাগই নিয়োগ পেয়েছেন আওয়ামী লীগের জমানায়।
তবে সিনিয়র হিসেবে প্রাধান্য পাওয়ার যে রেওয়াজ ছিল, অতীতে প্রায়ই তার ব্যত্যয় ঘটেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে অনেকটা দলীয় আনুগত্য বিবেচনায় আপিল বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে সিরিয়ালে অনেক পিছিয়ে থেকেও আপিল বিভাগে নিয়োগ পেয়েছেন অনেকে।
হাইকোর্টে বর্তমানে বিচারপতি আছেন ১০০ জন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে হাইকোর্টের বিচারপতিদের যে সিনিয়রিটি সিরিয়াল আছে, তার মধ্যে প্রথমজন— অর্থাৎ বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল নিয়োগ পেয়েছিলেন ২০০৪ সালে। তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। সিরিয়ালে দ্বিতীয় থেকে ৫২তম পর্যন্ত ৫১ জন বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছেন ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে— অর্থাৎ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে।
এ ছাড়া সিরিয়ালে ৫৩তম থেকে ১০০তম পর্যন্ত ৪৮ জন বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তাদের মধ্যে প্রথম দফায় নিয়োগ পাওয়া ২৩ জনের মধ্যে ২২ জনকে স্থায়ী করা হয় এক বছর পর। সাধারণত দুই বছর পর হাইকোর্টের বিচারপতিদের স্থায়ী করা হয়। এ ছাড়া দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ পাওয়া ২৫ এবং প্রথম দফায় নিয়োগ পাওয়া একজন এখনো স্থায়ী হতে পারেননি বা তাদের স্থায়ী করার সময় এখনো হয়নি। আর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কাউকে নিয়োগ দেননি হাইাকোর্টে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের আগে যেসব বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছেন, অর্থাৎ যাদের কয়েক বছরের বিচারিক অভিজ্ঞতা আছে, তাদের মধ্যে শুধু একজন বিএনপি সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া। সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া হলেও ওই বিচারপতি বর্তমান সরকারের আস্থায় নেই।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বেশিরভাগ বিএনপিপন্থী হলেও, তাদের কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগে অভিজ্ঞতা দুই বছরের বেশি নয়। ফলে আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে সংকটে আছেন বিচার বিভাগ।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বিচারকের তুলনায় আপিল বিভাগে মামলার সংখ্যা অনেক বেশি। মামলার নিষ্পত্তির পাশাপাশি প্রতিদিন নতুন নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে। ফলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমছে না। তিনি জানিয়েছেন, একটা সময় ছিল যখন আপিল বিভাগে একাধিক বেঞ্চে বিচারকাজ চলত। কিন্তু বিচারকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। সর্বোচ্চ আদালতে এসে মামলা ঝুলে যাচ্ছে।
বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. বদরুদ্দোজা বাদল আগামীর সময়কে বলেছেন, হাইকোর্টের যেকোনো বিচারপতিকেই আপিল বিভাগে নিয়োগ দেওয়া যায়। অতীতে সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে জুনিয়রদের মধ্য থেকেই আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো সমস্যা নয়।
এ ছাড়া সংকট সমাধানে সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্য থেকে আপিল বিভাগে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি বলেছেন, ‘সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্য থেকে সরাসরি আপিল বিভাগে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ আছে। তবে নজির নেই।’






