আগামীর সময়

অনুভূতিটা অম্লমধুর: তাজুল ইসলাম

অনুভূতিটা অম্লমধুর: তাজুল ইসলাম

সংগৃহীত ছবি

ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) আসামিপক্ষের আইনজীবী। দেশের প্রেক্ষাপট বদলের পর হলেন আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর। নতুন সরকারের আমলে দেড় বছরের মাথায় এবার ছাড়তে হলো পদ। 


বিদায়বেলায় এই অভিজ্ঞতাকে ‛অম্লমধুর’ বলে ব্যাখা করলেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। 


আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে সোমবার মিলল তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিলের খবর। আইসিটির নতুন প্রধান কৌঁসুলি হলেন প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম।


এই প্রক্রিয়ায় ‛অবাক হওয়ার কিছু নেই’ বলে মনে করেন তাজুল। তার মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে পছন্দের লোক বসাবেন, ‛যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’।


পদ হারানোের পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে দুপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন জামায়াতপন্থি এই আইনজীবী। নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে জানান স্বাগত ও শুভেচ্ছা। তার প্রত্যাশা, রেখে যাওয়া অসমাপ্ত দায়িত্ব পালনে সফল হবেন অ্যাডভোকেট আমিনুল।


একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গঠন করা হয় আইসিটি। সেসময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ছিলেন তাজুল ইসলাম। 


অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই পুনর্গঠন করে ট্রাইব্যুনালটি। সে বছরের ৮ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পান অ্যাডভোকেট তাজুল। তখন থেকে আইসিটিতে চলছে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের বিচার।


দেড় বছরের অভিজ্ঞতা ‛অম্লমধুর’ জানিয়ে তিনি বললেন, ‛বাংলাদেশের একটা কঠিন সময়ে আমি এখানে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম... এই মূল ভবনটি তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল... আগের প্রসিকিউশনে যারা ছিলেন, তারা সব কিছু এলোমেলো রেখে পালিয়ে গিয়েছিলেন... এরকম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম।’


নতুন সরকার গঠনের পর তাকে সরিয়ে দেয়া হবে- বিষয়টি আগে থেকে জানতেন কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তাজুল ইসলামের জবাব, ‛সরকারের কাছ থেকে আমাদেরকে প্রথমে বলা হয়েছিল যে, আমরা অ্যাজ ইট ইজ যেভাবে আছে, সেভাবেই চলবে। তারপর গতকালকে উনি আসলে আমাকে ধারণাটা দিয়েছেন যে, সরকারের ইচ্ছা যে- এখানে নতুন কাউকে রিপ্লেস করার...’


‛... তখন আমি নিজের থেকে বলেছিলাম যে তাহলে কি আপনারা চাচ্ছেন যে আমি পদত্যাগ করে চলে যাব? বলছেন না দরকার নাই। কারণ হচ্ছে যে ন্যাচারাল প্রক্রিয়াতে রিপ্লেসড হবে। পদত্যাগ করলে এটা ভিন্ন বার্তা যেতে পারত।’


দায়িত্বে থাকাকালে আইসিটির মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া ও রায় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী এই আইনজীবী।


‛আমি খুব কনফিডেন্ট। যে রায় হয়েছে, যে ডকুমেন্ট আমরা প্রডিউস করেছি—এই ব্যাপারে উচ্চ আদালতে গিয়ে জাজমেন্ট উল্টে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই... অতীতের ট্রাইব্যুনালের সমস্ত রেকর্ড ঘেঁটে দেখবেন, আমরা যে ধরনের শক্তিশালী প্রমাণ এখানে উপস্থাপন করেছি, এই ধরনের প্রমাণ কখনোই উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।’


এসব মামলায় ‛বেছে বেছে আসামি করা’ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তাজুল ইসলামের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে এটি বৈধ।

তার ব্যাখ্যা, ‛মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দুনিয়ার ইতিহাসে দেখবেন কোথাও গণহারে হাজার হাজার সৈন্যকে শাস্তি দেয়া হয় না। সেখানে টপ কমান্ডারদের দেয়া হয় এবং যারা একদম সরাসরি অ্যাট্রোসিটির সাথে ডাইরেক্ট ইনভলবমেন্ট ছিল তাদেরকেই সাজা দেয়া হয়’।


সবশেষে জানালেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফেরত যাবেন আইসিটির এই সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর।


অন্তবর্তী সরকারের আমলে আইসিটিতে তার নিয়োগ নিয়ে ছিল বিতর্ক। এ নিয়োগ ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করল কি না- তা নিয়ে সেসময় প্রশ্ন তোলেন সুপ্রিম কোর্টের একাধিক আইনজীবী।


আইনজীবীদের পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল।


কাউন্সিলের পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার বিধিমালার দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান মক্কেল কিংবা পুরাতন মক্কেলের মামলা পরিচালনাকালে একজন আইনজীবী যদি মামলা-সংক্রান্ত কোনো গোপনীয় তথ্যাদি সম্বন্ধে অবগত হইয়া থাকেন, তবে উক্ত আইনজীবী উক্ত তথ্য নির্ভর কোনো মামলায় উক্ত মক্কেলের বিপক্ষে আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত হইতে পারিবেন না।’

একই অধ্যায়ের ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘একজন আইনজীবী পরস্পরবিরোধী কোনো ব্যাপারে কোনো মক্কেলের প্রতিনিধিত্ব করিতে পারিবেন না।’


তার দায়িত্বকালে জুলাই অভ্যুত্থানসংশ্লিষ্ট এক মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফাঁসির দণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।


মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে খালাসও দেয়া হয় তাজুল ইসলামের মেয়াদে।


    শেয়ার করুন: