কী আছে আইনে
চাইলেই কি যেকোনো মূল্যে পণ্য বিক্রি করা যায়
- তদন্তের সিদ্ধান্ত সরকারের

ফাইল ছবি
একই পণ্য অন্যদের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে পারে ব্যবসায়ীরা। তবে তা উৎপাদন ব্যয়ের কম হবে না কোনোভাবেই। এ নিয়ম বাজারের প্রতিযোগিতার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে। মাত্র ৩০০ টাকায় পাঞ্জাবি বিক্রি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে নবীন ফ্যাশন। আরও বিস্ময়কর হচ্ছে— কম দামের নবীন পাঞ্জাবির সঙ্গে পাল্লা দিতে দিতে গিয়ে ব্যবসায় মার খাচ্ছিল নামকরা ব্রান্ড। পেরে না উঠে শেষ পর্যন্ত জবরদস্তির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে পুলিশকেও। বিষয়টি গড়িয়েছে আদালতেও।
সিন্ডিকেটের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ক্ষোভে হতাশায় গতকাল দেশ ছাড়েন নবীন পাঞ্জাবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফেজ এনামুল হাসান নবীন। রাজধানীর মগবাজার এলাকায় বিশাল সেন্টারে স্বল্প মূল্যের এই দোকান। প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, হিজড়া সম্প্রদায় এবং মাদকাসক্ত থেকে ফিরে আসা বিপন্ন মানুষ। এ কারণে সরবরাহকারীরা কম দামে পণ্য সরবরাহ করতেন। তাতেই ৩০০ টাকায় পাঞ্জাবি ও পাজামা বিক্রি করতে পেরেছেন তারা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ভিড় জমায়। এতেই তালগোল পাকায় প্রিন্সের মতো বেশি দামের পাঞ্জাবি বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট। তাদের হস্তক্ষেপের খবরে ঝড় উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। চরম বিতর্কের মুখে বিষয়টি তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
‘প্রতিযোগিতা আইনে-২০১২’ এ বিধান আছে একই পণ্য অন্যদের তুলনায় কম দামে বিক্রি করার। পাশাপাশি অস্বাভাবিক মূল্যে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করলে সেটিও একই আইনে অপরাধ।
চাইলেই কি যে কেউ কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ‘উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে সামান্য বেশি রেখে স্বল্পমূল্যে পণ্য বেচাকেনা যেকোনো বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা তৈরি করে। নবীন ফ্যাশন হাউজে এ রকম হয়ে থাকলে তাকে উৎসাহিত করা দরকার। তবে আমাদের জানা নেই তাদের পণ্যের উৎপাদন খরচ।’
কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারলেও উৎপাদন ব্যয়ের নিচে নামা যাবে না। এতে বাজারের প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়। তবে নবীন পাঞ্জাবির শো-রুমের ঘটনাটি আগামী সপ্তাহে কমিশনের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হবে— জানালেন কমিশন চেয়ারম্যান।
প্রতিযোগিতা আইনে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে বা সেবা প্রদানে অন্যায্য বা বৈষম্যমূলক শর্তারোপ করে বা পণ্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয়ে বৈষম্যমূলক মূল্য বা কৃত্রিমভাবে হ্রাসকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হলে সেটি হবে আইনের অপব্যবহার।’
কৃত্রিমভাবে হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য বিক্রির অর্থ হচ্ছে বাজারে প্রতিযোগিতাকে হ্রাস বা নির্মূল করা। কোনো ব্যক্তি কমিশনের এ বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক এক বৎসর কারাদণ্ড বা প্রতিদিনের ব্যর্থতার জন্য এক লাখ টাকা অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের হলেও প্রতিকার কম হচ্ছে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কারণে প্রশাসন খুব বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না। আর ঈদ ঘনিয়ে আসলে এ প্রবণতা চোখে পড়ে পোশাক মার্কেট ঘিরে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে পণ্যের উচ্চমূল্য শুধু বাহ্যিক বা আন্তর্জাতিক বাজারের কারণেই নয়। এর পেছনে আছে— প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের অভাব, বাজারের সিন্ডিকেট, প্রয়োজনীয় মনিটরিংয়ের অভাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে এসব অপরাধ প্রতিরোধে আইনের বড় দুর্বলতা রয়েছে— যা আছে, তারও প্রয়োগ কম। আবার কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে ‘গুরু পাপে লঘু দণ্ড’ নির্ধারিত রয়েছে। যে কারণে বারবার বেপরোয়া হয়ে উঠছেন ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লুটে নিচ্ছেন অবৈধ মুনাফা, যার মাশুল গুনতে হয় সাধারণ ভোক্তাদের।
নবীন ফ্যাশনের বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। যেখানে পাঞ্জাবির দোকান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তলব করা হয়েছে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে দোকান খুলে দেওয়ার জন্যও ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারা মোতাবেক জাস্টিস অব পিস হিসেবে স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।

