আগামীর সময়

যমুনায় নাকি গুলশানে, কোথায় আছেন ড. ইউনূস?

যমুনায় নাকি গুলশানে, কোথায় আছেন ড. ইউনূস?

সংগৃহীত ছবি

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ করে রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততা থেকে সরে এখন অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি সময় কাটাচ্ছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরও তিনি রাজধানীর রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনায় অবস্থান করছেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী আরো কিছুদিন সেখানে থাকার সুযোগ থাকলেও নিজ উদ্যোগেই বাসভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। পরিবার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ইউনূস সেন্টারে ফেরার প্রস্তুতি সব মিলিয়ে এখন তার দিন কাটছে ভিন্ন এক ছন্দে।


দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি কোথায় আছেন এবং কী করছেন এ নিয়ে নানা মহলে কৌতূহল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর তার আনুষ্ঠানিক ব্যস্ততা কমেছে বটে তবে কর্মতৎপরতা থেমে নেই।

প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব শেষে নিয়ম অনুযায়ী আরো তিন মাস যমুনায় থাকার সুযোগ থাকলেও তিনি আগেভাগেই বাসভবন ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ প্রেক্ষাপটে গণপূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি যমুনা পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।


অধ্যাপক ইউনূসের ঘনিষ্ঠজনরা গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, যমুনায় অবস্থানকালে তিনি পরিবারের সদস্যদের সময় দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গুছিয়ে নিচ্ছেন। ঈদের পর কিংবা মাসখানেকের মধ্যে গুলশানের নিজ বাসভবনে ফিরে যেতে পারেন, যদিও নির্দিষ্ট সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।


২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই তিনি যমুনায় বসবাস শুরু করেন। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি।

এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী গণমাধ্যমকে জানান, ইউনূস সেন্টারে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গোছানো এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পর্যালোচনার কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে অসুস্থ স্ত্রীর পাশে সময় দিচ্ছেন। অফিস-সংক্রান্ত কাজের ফাঁকে ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে দেখা করছেন এবং দায়িত্বকালীন অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করছেন।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানিয়েছেন, তার দীর্ঘদিনের ‘থ্রি জিরো’ ভিশন শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—কেন্দ্র করে নতুন কিছু উদ্যোগ নেওয়ার ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য সম্ভাবনাময় কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করছেন। তবে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়নি।

বিদেশ সফরের আমন্ত্রণও পাচ্ছেন নিয়মিত। সফর ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সমন্বয়ের কাজে তাকে সহায়তা করছেন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)–সংক্রান্ত সাবেক প্রধান সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ। কোথাও সরাসরি উপস্থিত হয়ে বক্তৃতা দেওয়া এবং কোথাও ভার্চুয়ালি অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। আগামী মাসে পাঁচ দিনের সফরে জাপান যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানা গেছে।

বর্তমানে তার দৈনন্দিন জীবনযাপন তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। সকালে ঘুম থেকে উঠে যমুনা প্রাঙ্গণে হাঁটাহাঁটি করেন। নাশতার পর সকাল ১০টার দিকে কাজ শুরু করেন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যারা তার সঙ্গে দেখা করতে চান, তাদের যেন সুযোগ দেওয়া হয়। দায়িত্বকালে সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকের সঙ্গে দেখা সম্ভব হয়নি; এখন তিনি সবার কথা শুনতে আগ্রহী।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। কেউ জানতে চান অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা, কেউ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত বা পেশাগত বিষয়ে মতামত বিনিময় করছেন।

দিনের কাজ শেষে তার সময় এখন পরিবারকেন্দ্রিক। অসুস্থ স্ত্রীর পাশে সময় কাটান, বিকেলে আবারও হাঁটাহাঁটি করেন। সন্ধ্যায় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সময় দেন। মেয়ের দুই বিড়াল—‘মিনু’ ও ‘কায়রো’র সঙ্গেও তার সখ্যের মুহূর্ত কাটে।

এদিকে জানা গেছে, দায়িত্ব পালনকালেই তিনি তার কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন প্রায় এক সপ্তাহ আগে তিনি পাসপোর্টটি জমা দেন।

স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টার পদমর্যাদার প্রায় ২০ জন ইতিমধ্যে তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন। অধিকাংশই ভোটের আগেই পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনার পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হলেও সামাজিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা এবং ‘থ্রি জিরো’ দর্শনের নতুন সম্ভাবনা সামনে রেখে এখন নতুন পর্বের প্রস্তুতিতে সময় পার করছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

    শেয়ার করুন: