রাড্ডাকাণ্ডে জড়িতরা শনাক্ত, তবুও ধরাছোঁয়ার বাইরে

সংগৃহীত ছবি
রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। সে ঘটনার পেরিয়েছে পাঁচ দিন। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত হয়েছে হামলাকারীদের পরিচয়ও। এমনকি হামলার নির্দেশ কে দিয়েছেন, কার কার পরিকল্পনায় হয়েছে ভাঙচুর— সেসব নামও আসছে সামনে। কিন্তু এখনো অধরা সেই মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতারা। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা কেউ-ই হামলার ‘নেপথ্য নায়ক’ নন। তাদের বেশিরভাগই টাকার বিনিময়ে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, এ ঘটনায় করা মামলায় নাম উল্লেখ করা একমাত্র আসামি হানিফকে গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে। তদন্ত নিয়ে কোনো চাপ নেই বলেও জানালেন তারা।
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটিতে হামলার ঘটনায় সরকার বিব্রত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি এবং পরে তাদের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নেরও তদন্ত করা হচ্ছে।’
হামলার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে নানা তথ্য। সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, হামলার আগে শাহ আলী থানার পাশে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতার অফিসের সামনে লোকজন জড়ো হয়। পরে তাদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যায়। হামলার সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে একটি সাদা মাইক্রোবাস এবং কয়েকটি মোটরসাইকেলের গতিবিধিও ধরা পড়ে ওই এলাকার বিভিন্ন সিসি ক্যামেরায়। এ ছাড়া জানা গেল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙার জন্য ব্যবহৃত এক্সকাভেটরটি ভাড়া করা হয়েছিল আগেই।
তদন্তে সবশেষ কী জানা গেছে, তা জানতে চাইলে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাজীব হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘এ ঘটনায় মঙ্গলবার পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান ও একমাত্র আসামি হানিফকে গ্রেপ্তারের চেষ্টায় সবাই কাজ করছে। তদন্ত কর্মকর্তা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের পরিচয় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।’
ভাঙচুরের রাতের সিসিটিভি ফুটেজে আগামীর সময় দেখতে পেয়েছে, ঘটনার রাতে প্রথমে দেখা যায় শাহ আলী থানার কাছাকাছি থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিনের কার্যালয়ের সামনে একদল মানুষ জড়ো হয়েছে। রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে এগোতে দেখা যায়। যার মধ্যে হলুদ টি-শার্ট পরা যুবকের নাম আরিফ। তিনি শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। লাল টি-শার্ট পরা শামীম এবং টুপি পরা হাসানও স্থানীয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার ছোট ভাই শামীমকেও ঘটনাস্থলে দেখা যায়। হামলাকারীদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় গিয়ে লাঠি, রামদা, হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করে। এরপর কেউ কেউ মাথায় কাপড় ও মুখোশ বেঁধে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে।
ভাঙচুরের নেতৃত্বে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ওরফে নাডা আওলাদ এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াসের নাম এসেছে। এ ছাড়া আরাফাত নামে একজনের নাম এলেও তার পরিচয় জানা যায়নি। ভাঙচুর ও লুটপাটের সময় বাইরের পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বুলু ও কবির ওরফে টাক্কু কবিরকে মোটরসাইকেলে টহল দিতে দেখা যায়।
ঘটনার পাশেই দাঁড়িয়েছিল সাদা মাইক্রোবাস। তদন্তের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, ওই মাইক্রোবাসে ছিলেন হানিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ আরও কয়েকজন। হামলা ও ভাঙচুরের সময় মাইক্রোবাসটি থেকে ঘটনাস্থলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশনা দেওয়া হয়।
জানা গেল, হানিফ মিয়া ও আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাদের মধ্যে লেলিন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে এলাকায় ব্যানার ও পোস্টার লাগিয়েছেন।
এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে কোনো ধরনের বাধা বা চাপ রয়েছে কি না— জানতে চাইলে মিরপুর বিভাগের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের আগামীর সময়কে বললেন, ‘ঘটনার তদন্ত চলছে। জড়িতদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোনো ধরনের চাপ নেই। ঘটনার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার ও উদ্ধার: পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ১২ জন হলেন— মো. সোহেল (২২), মো. জুয়েল (২৩), জিহাদ হাসান (২১), মো. রাব্বি (২০), শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), শাহ আলম (৫৩), আতিকুর রহমান (৩৩), কামরুল ইসলাম (৫২), শাকিল (২০), মো. মিন্টু (৩৫) ও মো. মিলন (৪৫)। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের লুট হওয়া আসবাব, টিকা, রেজিস্টার, ফ্রিজ, অফিসের কাগজপত্র, প্রিন্টার, জেনারেটরসহ ৪৬ ধরনের মালামাল উদ্ধার করেছে। মালামাল বহনে ব্যবহৃত দুটি কাভার্ড ভ্যান ও ভেকুও জব্দ করা হয়েছে।
জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হবে— তথ্য উপদেষ্টা: হামলার ঘটনায় সরকার বিব্রত— বললেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। জানালেন, জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হবে। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বললেন, ‘গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে ও সিসিটিভি ফুটেজে যাদের নাম বা পরিচয় পাওয়া গেছে, তাদের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পুলিশের তদন্তের বিকল্প নয়। তবে পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত চার্জশিট হবে।’



