চীন সফর
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ৩ অগ্রাধিকার প্রধানমন্ত্রীর
- দালিয়ান থেকে কাল যাবেন বেইজিং

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তিনটি অগ্রাধিকারের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
‘জলবায়ু সহনশীলতা কোনো দেশ একা গড়ে তুলতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন অংশীদারিত্ব, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং যৌথ অঙ্গীকার’—উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চীনের দালিয়ান শহরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নেতৃত্ব’ শীর্ষক অধিবেশনে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তিনটি অগ্রাধিকারের ওপর জোর দেন। প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য সহায়তাসহ ‘ক্ষয়ক্ষতি তহবিল’কে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরও সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং চাহিদাভিত্তিক হতে হবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও ত্বরান্বিত হওয়া উচিত। এ লক্ষ্যে আমাদের ‘সবুজ জলবায়ু তহবিল’-এর বৃহত্তর সংহতকরণ ও কার্যকরীকরণ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রশমন কার্যক্রমের পাশাপাশি অভিযোজনও অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন কোনো নীতিগত বিকল্প নয়; এটি একটি অপরিহার্য বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়। আমরা এটিকে সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং একটি যৌথ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখি। এখানে উপস্থিত সকলে মিলে আমরা একটি সবুজতর, নিরাপদতর, টেকসই এবং আরও ন্যায্য ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, সবুজ শিল্পের বিকাশে পাটশিল্প ও পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইলেকট্রিক ভেহিকেল) চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেছেন, ‘জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়; এটি আমাদের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ।’
‘আমাদের সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সৌর, বায়ু, বর্জ্য থেকে শক্তি এবং অন্যান্য সমাধানের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বাংলাদেশের অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার, জৈব সার উৎপাদন এবং চক্রাকার অর্থনীতি উদ্যোগের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনাও করছে। তাই এখন আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি এলইইডি প্রত্যয়নপ্রাপ্ত কারখানার মধ্যে ৬৯টিই বাংলাদেশের’— উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেছেন, ‘এখন সময় এসেছে জলবায়ু-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিকে কাজে এবং অঙ্গীকারকে ফলাফলে পরিণত করার, যাতে বিশ্ব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যৎকে আলিঙ্গন করতে পারে। আমরা আশা করি, কপ-৩১ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে এবং বাংলাদেশ তার ভূমিকা পালনে প্রস্তুত।’
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগকে বৈশ্বিক পরিসরে কাজে লাগানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সৃষ্টি করবে।’
স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব কথা বলেন আলোইস জভিংগি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, এ সাক্ষাতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো অন্যান্য বদ্বীপ রাষ্ট্র (ডেল্টা স্টেট) এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সহযোগিতায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
‘২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার’—যোগ করেন তারেক রহমান।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী’
সন্ধ্যায় দালিয়ানের সাংগ্রি-লা হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈশ্বিক সম্মেলনে যোগদানের লক্ষ্য বাংলাদেশে অধিকতর বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করা। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’— এই বার্তার মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আস্থাশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেছেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে যেভাবে জনগণের আস্থা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ও আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে গৃহীত হচ্ছেন।’
‘দীর্ঘদিন পর বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক (স্টেটসম্যান) প্রতিনিধিত্ব করছেন, যিনি সমতা, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কার্যকরভাবে ধারণ করছেন। একই সঙ্গে নিশ্চিত করছেন বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান’— যোগ করেন মাহদী আমিন।
চীনের প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে তারেক রহমান
মাহদী আমিন জানান, দালিয়ানের ‘সামার দাভোসে’ অংশ নেওয়া সরকারপ্রধানদের সম্মানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের দেওয়া নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সিওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম-ওসোরিন উচরাল, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু ওউরি বাহ, মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোজকো স্পাজিচ এবং কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকটেনভ ওই ভোজসভায় উপস্থিত ছিলেন।
‘এটি ছিল সাত দেশের সরকারপ্রধানের একসঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভোজ, যেখানে উন্মুক্ত আলাপচারিতার সুযোগ ছিল।’
আগামীকাল বুধবার সকালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অন্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর স্থানীয় সময় বুধবার দুপুর ২টায় দালিয়ান থেকে উচ্চগতির (হাই-স্পিড) ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী।
গত সোমবার মালয়েশিয়া থেকে পাঁচ দিনের সফরে চীনে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে তিনি দালিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, বিমানবন্দরে চীন সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করে এবং মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হোটেলে নিয়ে যায়। পুরো রাস্তাজুড়েই ছিল রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল ও পুলিশি নিরাপত্তা। আগামী ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।





