ঈদে সবচেয়ে ব্যস্ত যারা

সংগৃহীত ছবি
ঈদের দিন। চারদিকে আনন্দ আর উৎসবের আবহ। কেউ পরিবারের সঙ্গে ঈদের নামাজে যাচ্ছেন। কেউ কোরবানির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কেউ দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন প্রিয়জনদের কাছে। ঠিক তখনই দেশের কোথাও একজন চিকিৎসক জরুরি বিভাগে রোগী দেখছেন। একজন পুলিশ সদস্য রাস্তায় দায়িত্ব পালন করছেন। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কোরবানির বর্জ্য সরাতে ব্যস্ত। একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মী অপেক্ষায় আছেন জরুরি কোনো কলের। আবার কোথাও একজন গণমাধ্যমকর্মী ক্যামেরা, মাইক্রোফোন কিংবা ল্যাপটপ হাতে ছুটছেন খবর সংগ্রহে— যাতে মানুষের ঈদের আনন্দ, ভোগান্তি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো পৌঁছে যায় সবার কাছে।
তাদের জন্য ঈদ মানে শুধু উৎসব নয়, দায়িত্বও। অন্যরা যাতে স্বস্তিতে ঈদ উদযাপন করতে পারেন, সেজন্য নিজের আনন্দের একটি অংশ ত্যাগ করেন তারা। পরিবার থেকে দূরে থেকে, ছুটি না নিয়েই কাজ করে যান। ঈদের দিনের সবচেয়ে বড় ব্যস্ততাগুলো তাই সামলাতে হয় সেই মানুষগুলোকেই, যাদের কথা উৎসবের আনন্দে খুব একটা মনে করা হয় না। অথচ তাদের শ্রম আর দায়িত্ববোধের কারণেই নির্বিঘ্নে কাটে লাখো মানুষের ঈদ।
হাসপাতালে থামে না ব্যস্ততা
কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে। পশু কোরবানি দিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত হাত-পা কেটে যাওয়া, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হওয়া কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে আসেন।
ঈদের দিনেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেরই ছুটি থাকে না। রোগীর সেবা নিশ্চিত করতে তাদের থাকতে হয় কর্মস্থলে। যখন পরিবারের সদস্যরা ঘরে ঈদের খাবারের আয়োজন করেন, তখন হাসপাতালের অনেক চিকিৎসক ও নার্স ব্যস্ত থাকেন জরুরি রোগীদের চিকিৎসা দিতে।
নিরাপত্তায় পুলিশ
ঈদযাত্রা, পশুর হাট, মহাসড়ক এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঈদের ছুটিতে মানুষ যখন গ্রামের বাড়ি যান, তখন ফাঁকা বাসাবাড়ির নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ প্রতিরোধে মাঠে থাকতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
অনেক পুলিশ সদস্য বছরের পর বছর ঈদের দিন কর্মস্থলেই কাটিয়ে দেন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের সুযোগ তাদের জন্য অনেক সময়ই সীমিত হয়ে পড়ে।
দুর্ঘটনা ও আগুনে প্রস্তুত ফায়ার সার্ভিস
ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের জন্যও ঈদ মানেই প্রস্তুতির সময়। কারণ দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ড বলে কয়ে আসে না। ঈদের দিনেও তাদের থাকতে হয় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে। কোথাও আগুন লাগলে, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে কিংবা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত থাকেন তারা। অনেক সময় একটি কলই বদলে দেয় তাদের পুরো দিনের পরিকল্পনা।
শহর পরিষ্কারে নিরলস পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা
কোরবানির ঈদের আরেকটি বড় দায়িত্ব থাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর। দেশের বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ পশু কোরবানি হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ করতে হয়। ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেন তারা।
শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে আনতে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের এই শ্রমের কথা খুব কমই আলোচনায় আসে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সেবায় কর্মরতরা
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদেরও ঈদের সময় থাকতে হয় প্রস্তুত। ছুটির দিনেও তারা দায়িত্ব পালন করেন, যাতে কোনো এলাকায় সেবা বিঘ্নিত হলে দ্রুত সমাধান করা যায়। কারণ উৎসবের দিনে সামান্য সমস্যাও মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই অন্যরা যখন পরিবার নিয়ে সময় কাটান, তখন এসব কর্মীরা নিশ্চিত করেন প্রয়োজনীয় সেবা সচল আছে কি না।
চাকার সঙ্গে ঘোরে যাদের ঈদ
বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও অন্যান্য পরিবহন খাতের কর্মীদের জন্য ঈদ মানেই বাড়তি দায়িত্ব। ঘরমুখো মানুষের চাপ সামলাতে চালক, সহকারী, স্টেশন কর্মী ও সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে হয় নিরবচ্ছিন্নভাবে।
হাজারো মানুষকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাদের কাঁধে থাকে পুরো ছুটি জুড়ে।
খবরের পেছনে ছুটে চলা গণমাধ্যমকর্মীরা
ঈদের দিনেও থেমে থাকে না সংবাদমাধ্যমের কাজ। টেলিভিশন, পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল কিংবা রেডিও— সবখানেই কর্মরত সাংবাদিক, ক্যামেরাপারসন, ফটোসাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের ব্যস্ত থাকতে হয় মাঠে।
কোথাও ঈদযাত্রার ভোগান্তি, কোথাও দুর্ঘটনা, কোথাও উৎসবের আনন্দ—সব খবর দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ছুটে বেড়ান তারা। যখন অধিকাংশ মানুষ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, তখন অনেক গণমাধ্যমকর্মীর ঈদ কাটে নিউজরুম, রাস্তাঘাট কিংবা ঘটনাস্থলে।
নেপথ্যের নায়করা
ঈদের আনন্দ সবার মধ্যে পৌঁছে দিতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের অনেকেই থাকেন আড়ালে। চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বিদ্যুৎকর্মী, পরিবহন শ্রমিক কিংবা গণমাধ্যমকর্মী— প্রত্যেকেই নিজেদের উৎসবের কিছুটা ত্যাগ করে অন্যদের স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
তাই ঈদের আনন্দের এই সময়ে পরিবার-পরিজনের পাশাপাশি স্মরণ করা উচিত সেই মানুষগুলোকেও, যাদের দায়িত্ববোধের কারণেই নির্বিঘ্নে উদযাপিত হয় আমাদের উৎসব।






