পুলিশই নিরাপদ নয় কাজে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাড়ি দখল কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার হাশেমবাগে হামলা ও লুটপাট হচ্ছে। গত বুধবার বিকালে এমন খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। স্থানীয় জনি গ্রুপের সহযোগী হিসেবে পরিচিত দুজনসহ পাঁচজনকে আটক করে হাতকড়া পরানো হয়। তবে তাদের থানায় নেওয়া যায়নি। এর আগে পুলিশের ওপর চালানো হয় হামলা, ছিনিয়ে নেওয়া হয় ওই পাঁচজনকে। পুলিশের দাবি, সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত জনির নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল লোক এ হামলা চালায়।
পুলিশের ওপর এ ধরনের হামলার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মাসে এ ধরনের ৮১৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে চার মাসেই ঘটেছে ২১৩টি ঘটনা।
গত মঙ্গলবারও নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর এলাকায় ধারালো অস্ত্রের হামলায় আহত হন র্যাবের তিন সদস্য। এ ছাড়া রূপগঞ্জের চনপাড়ায় যুবদল নেতা শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ তাকে ছিনিয়ে নেন।
এভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়ছে পুলিশ। অপরাধীদের এমন সংঘবদ্ধ ও বেপরোয়া তৎপরতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটির মধ্যে বাড়ছে অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা। সাধারণ মানুষও পাচ্ছেন না স্বস্তি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কিছুদিন নিষ্ক্রিয় ছিল পুলিশ। এর সুযোগে অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখনো রয়ে গেছে; মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। এ আচরণের পেছনে ‘মব সংস্কৃতি’কেও দায়ী করা হচ্ছে। আর এসব নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, খোদ পুলিশ বাহিনীই যদি নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা ঠিক থাকবে কী করে?
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর ৬০১টি হামলা হয়েছে। আর চলতি বছরই ঘটে গেছে ২১৩টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৪২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৬৩টি ও এপ্রিলে ৬৬টি হামলার ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ প্রতি মাসেই বাড়ছে হামলা।
গত ১৬ মাসে পুলিশের ওপর সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ডিএমপিতে, ১১২টি। সবচেয়ে কম আরপিএমপিতে, ৪টি। এ ছাড়া সিএমপিতে ৫৫টি, কেএমপিতে ১২, আরএমপিতে ১১, বিএমপিতে ১৩, এসএমপিতে ২১ ও জিএমপিতে ৩১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
রেঞ্জ হিসেবে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা রেঞ্জে, ১৭৬টি। সবচেয়ে কম বরিশাল রেঞ্জে, ২৭টি। অন্য রেঞ্জগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহে ৩৫টি, চট্টগ্রামে ১২৩, সিলেটে ৫৭, খুলনায় ৪৭, রাজশাহীতে ৬১ এবং রংপুর রেঞ্জে পুলিশের ওপর ১৬ মাসে ৩৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার নেপথ্যে কী থাকতে পারে, তা জানতে কথা হয় মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুকের সঙ্গে।
তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি মনে করি—বর্তমান অপরাধীরা বিভিন্ন অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে সংঘবদ্ধভাবে কাজ করছে বলেই পুলিশকে আক্রমণ করার মতো সাহস পাচ্ছে। পুলিশ যেখানে মানুষকে আইনি সুরক্ষা দেবে, সেখানে পুলিশই যদি ভিক্টিম বা আহত হন, তবে তা জাতীয় জীবনের জন্য উদ্বেগের বিষয়।’
পুলিশকে ভয় পাইয়ে মনোবল ভেঙে দেওয়া অপরাধীদের মূল লক্ষ্য থাকে জানিয়ে তিনি বলছিলেন, পুলিশ যদি নিজেদের নিরাপদ মনে না করে, তবে তারা অপরাধীদের বিরুদ্ধে সেভাবে সোচ্চার হতে পারবে না। এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি।
‘এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো, পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, এপিবিএন, পিবিআইসহ অন্যান্য বিশেষায়িত বাহিনীগুলোকে আরও সক্রিয় করা। কোনো শক্তিশালী অপরাধী বা সংঘবদ্ধ চক্রকে দমনে পুলিশ এককভাবে অভিযানে না গিয়ে যদি এই বিশেষায়িত বাহিনীগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান চালায়, তবে অপরাধীরা হামলার সাহস পাবে না।’
এ ছাড়া পুলিশের ওপর কোনো আঘাত এলে তার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে— এমন একটি কঠোর বার্তা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায় বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বললেন অন্য প্রসঙ্গে। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব জাস্টিস বা সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। তবে একটি নির্বাচিত সরকারের সময়েও যদি এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়, তা রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক।
এ অবস্থায় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন হবে, সে বিষয়ে তার কাছে প্রশ্ন ছিল। জবাবে তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই সরকারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। এভাবে যদি পুলিশের ওপর হামলা চলতে থাকে, তাহলে সরকারেরই দুর্নাম হবে। পুলিশকে একদিকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দেওয়া, আবার অন্যদিকে অতিরিক্ত দমনমূলক আচরণ করা— দুই পথই ক্ষতিকর। বরং দোষীদের বিচারের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’
পুলিশ সদস্যদের আস্থায় নিয়ে পেশাগত আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি— যোগ করলেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি কিছুটা ধীরগতিতে হচ্ছে— স্বীকার করলেন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত আইজি (অপরাধ ও অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘একদিকে মনোবল হারানো পুলিশ বাহিনী, অন্যদিকে অপরাধীদের বেপরোয়া আচরণ— দুয়ের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আমরা সেভাবেই নিয়মের মধ্যে থেকে অভিযান পরিচালনা করছি।’




