২০০০ কোটির অনলাইন গেমস বাজারে নজর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন উৎস খুঁজছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া অনলাইন গেমিং খাতকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা, অনলাইন লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে চলে যাওয়া ঠেকাতেই নেওয়া হচ্ছে এই উদ্যোগ।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিসটার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনলাইন গেমিং বাজারের আকার বর্তমানে ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এই খাতের বড় অংশের লেনদেন এখনো রয়েছে কর ব্যবস্থার বাইরে।
রাজস্ব কর্মকর্তারা জানান, গেমের ভেতরে কেনাকাটা (ইন-অ্যাপ পারচেজ), সাবস্ক্রিপশন ফি, ভার্চুয়াল গেমিং কারেন্সি এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আরোপের বিষয়টিও রয়েছে বিবেচনায়।
বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক গেমিং প্ল্যাটফর্মে স্কিন, ক্যারেক্টার, ভার্চুয়াল কয়েন ও প্রিমিয়াম সুবিধা কিনতে ব্যয় করছেন অর্থ। কিন্তু এসব লেনদেনের অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে করের আওতার বাইরে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব লেনদেনকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনা গেলে একদিকে রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে সীমান্তপারের ডিজিটাল লেনদেন পর্যবেক্ষণও সহজ হবে।
এ সব লেনদেনে অন্তত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হলে, এখান রাজস্ব আদায় হবে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা, যোগ করেন তারা।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে থাকায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও রাজস্ব বাড়ানোর চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ডিজিটাল খাতকে নতুন কর উৎস হিসেবে দেখছে সরকার।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলেছেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক কার্ড ও অ্যাপ স্টোরের মাধ্যমে হওয়া পেমেন্টে স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট কর্তনের ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে গেমিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে একটি প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীও তাতে সায় দিয়েছে বলে জানান এনবিআরের কর্মকর্তারা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে অনলাইন গেমিং ও ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপ করেছে। ভারতে অনলাইন গেমিংয়ে ২৮ শতাংশ জিএসটি আরোপের ফলে সরকারের রাজস্ব বেড়েছে, যদিও এতে গেমিং কোম্পানিগুলোর ব্যয়ও বেড়েছে।
পাকিস্তান ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স ও ভ্যাট চালু করেছে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া ডিজিটাল পণ্যে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় এনেছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্পষ্ট আইনি কাঠামো ছাড়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, কোন গেম দক্ষতানির্ভর এবং কোনটি জুয়া বা বেটিংয়ের পর্যায়ে পড়ে, তা আগে পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেছেন, “আইনি সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে কর বাস্তবায়ন বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল ডাটা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত শক্তিশালী নয়। ফলে বিদেশভিত্তিক গেমিং প্রতিষ্ঠান যেমন টেনসেন্ট বা অ্যাক্টিভিশন ব্লিজার্ড থেকে কার্যকরভাবে কর আদায় করা কঠিন হতে পারে।
তার মতে, অতিরিক্ত কর আরোপ করা হলে ব্যবহারকারীদের একটি অংশ অবৈধ বা অননুমোদিত বেটিং প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যাবে।
নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কর আরোপ করলেই হবে না; এই খাতের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালাও প্রয়োজন।
তারা বলছেন, গেমিং প্ল্যাটফর্মের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট কর্তন এবং গেমিং ও জুয়ার মধ্যে পৃথক আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সঠিক নীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে অনলাইন গেমিং খাত থেকে বছরে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আইনি প্রস্তুতি ছাড়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।




