শেষ সময়ে খরচে দৌড়

গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতির প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়ক থেকে তোলা -আগামীর সময়
গত ৩০ এপ্রিল বাসা বদলানোর জন্য তিন-চারজন মিলে মালামাল মাথায় করে অনেকদূর পথ মাড়িয়ে কোনো রকমে হাঁটছিলেন ভ্যানচালক আলিনুর। বেশ খানিকটা দূরে রাখা ভ্যানে উঠাচ্ছিলেন আসবাবপত্র। মাথা থেকে ঘাম ঝরে ভিজে যাচ্ছিল শরীর। এ সময় কথা হয় তার সঙ্গে— জানালেন, তার বাসার সামনে রাস্তা কেটে সংস্কার করা হচ্ছে। রাস্তার নিচে বড় বড় পাইপ বসাতে দেখছি। প্রায় ১০-১২ দিন ধরেই চলছে এই কাজ। মাটি কেটে রাখায় চলাচলের রাস্তা প্রায় বন্ধ। তার ওপর বাসা বদলানোর কারণে আসবাবপত্র বহন করাটা অনেক কষ্টের। দুজন শ্রমিক ভাড়া করতে হয়েছে শুধু বাসা থেকে ভ্যানে মালামাল তোলার জন্য। এখানে তার সময়, টাকা এবং কষ্ট সবই যাচ্ছে। এ দৃশ্য মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার শাপলা সরণির। এখানকার বাসিন্দাদের দিন কাটছে দুর্বিষহ যন্ত্রণায়। দ্রুত যে কাজ হচ্ছে সেটিও নয়। এমন দৃশ্য পুরো রাজধানী জুড়েই। সেই সঙ্গে সারা দেশেরও। কোথাও হয়তো রাস্তা, কোথাও ফুটপাত আবার কোথাও ড্রেন বা বিল্ডিং, ব্রিজ তৈরি ও সংস্কারের নামে জনদুর্ভোগ চলছেই।
একই চিত্র মিরপুরের রোকেয়া সরণির। রাস্তার দুই পাশে ফুটপাত কেটে করা হচ্ছে সংস্কার। এতে প্রায় সময়ই যানজট লেগে যাচ্ছে। মোহাম্মদপুরের আল্লাহকরিম মসজিদের সামনেও কাটা হয়েছে রাস্তা। কুড়িল বিশ্বরোডের পাশে নর্দা ও নতুন বাজার এলাকায় ফুটপাত সংস্কার চলছে দীর্ঘ দিন ধরেই। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অফিসের সামনের চিত্রও একই। শান্তিনগর এলাকায় স্যুয়ারেজ সংস্কারের এলাকাবাসীর দিন কাটছে কষ্টে।
কেন এমন হয় প্রতি বছর। এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। এর উত্তর খুঁজতে কথা হয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। তারা বলছেন, অর্থবছরের শেষ সময় বিল নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়া শুরু হয়। টাকা খরচই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু কি কাজ হলো, না হলো সেদিকে নজর নেই কারও। যেনতেন কাজ শেষ করে বিল তুলতে পারলেই অর্থবছর শেষের জটিলতা এড়ানো যায়। বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, অর্থবছরের শেষ সময়ে কাজ করতে গিয়ে একদিকে যেমন অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত হয় না। পাশাপাশি ব্যাপক দুর্নীতিরও সুযোগ তৈরি হয়। এ অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেওয়া আছে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত অর্থাৎ গত ৯ মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো খরচ করতে পেরেছে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। বাকি তিন মাসে এপ্রিল, মে ও জুনে খরচ করতে হবে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। প্রশ্ন হলো, যেখানে নয় মাসে খরচের খাতার অবস্থা এই, সেখানে মাত্র তিন মাসে এত টাকা ব্যয় করা কীভাবে সম্ভব। তবে এর উত্তর আছে দায়িত্বশীলদের কাছে। রাজধানীর খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে ব্যাখ্যা দিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, এখানে সরাসরি সিটি করপোরেশনের কাজ খুব বেশি নেই। আমরা শুধু অনুমতি দিই। যেমন ঢাকা এখন কাজ চলছে ডিপিডিসির, মেট্রোরেলের এবং ঢাকা ওয়াসার। আমাদের কিছু ভেতরের রাস্তায় ছোট কাজ চলছে। ওয়াসার দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটি দাসেরকান্দি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পাইপলাইন স্থাপন এবং স্যুয়ারেজসংক্রান্ত একটি। চাইনিজ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি আছে তাদের। সেই মতো করে তারা কাজ করছে। এ ছাড়া সরকার পরিবর্তনের পর মেট্রোরেলের কাজ স্থবির হয়ে আছে। ডিপিপিসির কাজও চলছে ধীরে। তারা আমাদের যে টাইমলাইন দিয়েছে সে অনুযায়ী কাজ শেষ করতে পারছে না। এখানে তো সমন্বয় করা সম্ভব হয় না।




