চোখের আলো কাড়ছে ১০০ টাকার চশমা
- বিশ্বের প্রায় ২.২ বিলিয়ন মানুষ চোখের সমস্যায় ভুগছে
- নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন সঠিক চশমা পায় না

সংগৃহীত ছবি
শেষ বিকালের পল্টন মোড়। ফুটপাত থেকে সড়ক, সবখানেই ভীষণ ভিড়। সেই ব্যস্ত সময়ে ভিড়-ভাট্টার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন ঝিনাইদহ থেকে আসা আবু রায়হান ও মোসলেম উদ্দিন। হঠাৎ চশমা ভেঙে যাওয়ায় বিকল্প খুঁজছিলেন তারা। পেয়েও গেলেন ফুটপাতের দোকানে। দাম মাত্র ১০০ টাকা। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, চশমা চোখে দিয়ে পড়া গেলেই হলো, এই ভাবনা থেকেই কিনে নিলেন রেডিমেড চশমা।
শুধু পল্টন নয়, রাজধানীর গুলিস্তান, মালিবাগ, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন সড়কের পাশে বা ফুটপাতে দেখা মিলবে ১০০ টাকার চশমা বিক্রেতাদের। বেশিরভাগ জায়গাতেই দোকানগুলোয় বাজানো হয় অডিও রেকর্ড। যেখানে বলা হয়, ‘চোখে কম দেখেন? মাথাব্যথা? আমাদের কাছে আছে ফ্রি পাওয়ারের চশমা। যে কেউ ব্যবহার করতে পারবেন। দাম মাত্র ১০০ টাকা।’ আর এসব চশমা কিনতে সেখানে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ।
পল্টনে চশমা বিক্রি করছিলেন ইকবাল রহমান। তিনি মূলত মৌসুমী ব্যবসায়ী। ক্রেতা চাহিদা দেখে এই ১০০ টাকার চশমা বিক্রি করতে শুরু করেছেন। ইকবাল বললেন, ‘মানুষ এসে বলে মাথাব্যথা কমানোর বা চোখে ভালো দেখার চশমা আছে কি না। তাই রাখছি। এতে সাধারণত কোনো সমস্যা হয় না।’
বাংলা মোটর এলাকায় লতিফ নামে আরেক বিক্রেতাকে দেখা গেল মাইকিং করে ক্রেতা টানতে। তিনি জানালেন, প্রতিদিন বেশ কয়েকটি চশমা বিক্রি হয়, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষই বেশি কেনেন।
প্রচার দেখে ফুটপাত থেকে ১০০ টাকা দিয়ে পাওয়ারযুক্ত চশমা কিনেছিলেন জোসনা বেগম। শুরুতে ঠিকঠাক দেখছিলেন। কোনো সমস্যা হচ্ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন যেতেই টের পেলেন চোখ ব্যথা করছে, মাথা ধরে থাকছে। বাধ্য হয়েছে যান চোখের চিকিৎসকের কাছে। তার দেওয়া পাওয়ারযুক্ত চশমা পরে স্বস্তি ফিরে পান তিনি।
রেজাউল (৫০) নামের আরেক ভুক্তভোগী বললেন, ‘কম টাকায় কাজ সারতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে চোখের সমস্যা বাড়তে বাড়তে অপারেশন পর্যন্ত করতে হয়েছে।’
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রেডিমেড চশমা ব্যবহার চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে, বলছে বিভিন্ন গবেষণা। চিকিৎসকরাও বললেন, ভুল পাওয়ারের চশমা দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে চোখের চাপ বেড়ে যায়, দৃষ্টিশক্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি মাথাব্যথা ও স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হয়। সে কারণে নিয়মিত সময় পরপর পাওয়ার পরীক্ষার পরামর্শও দেন তারা।
শিশু চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন প্রফেসর ডা. মো. জান-ই-আলম মৃধা আগামীর সময়কে বললেন, ‘চোখের সমস্যা বা মাথাব্যথা হলে রাস্তা থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া চশমা কেনা ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিক চশমা ব্যবহারের আগে কম্পিউটারাইজড বা ম্যানুয়াল পরীক্ষার মাধ্যমে চোখের নির্ভুল পাওয়ার নির্ধারণ করা জরুরি। অনেকেই সাময়িকভাবে কিছুটা ভালো দেখতে পেয়ে মনে করেন চশমাটি উপকারী, কিন্তু এতে দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ঠিক হচ্ছে কি না তা বোঝা যায় না।’
ভুল পাওয়ারের চশমা ব্যবহারে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, ঝাপসা দেখা ও দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হতে পারে বলেও জানালেন তিনি। সেই সঙ্গে শিশুদের তিন-ছয় মাস পরপর এবং বড়দের বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা করানোর পরামর্শও দিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (জিবিডি)–এর সাম্প্রতিক (২০২৫) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় দৃষ্টিজনিত সমস্যা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব জুড়ে প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মানুষ চোখের সমস্যায় ভুগছেন। যার অন্তত এক বিলিয়ন ক্ষেত্রে চিকিৎসা সম্ভব। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন সঠিক চশমা পায় না, এ তথ্যও উঠে এসেছে গবেষণায়।
ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. শাহেদ হায়দার চৌধুরী বললেন, চোখ পরীক্ষা না করে ফুটপাত থেকে চশমা কিনলে চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। ভুল লেন্সের কারণে চোখ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং মাথা ঝিমঝিম করতে পারে।
তিনি বলছিলেন, ‘একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা যাবে না। এ ছাড়া রাত জাগা, ঘরের আলো বন্ধ করে মোবাইল বা কম্পিউটার দেখা যাবে না। আর যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস তারা চার মাস পর পর চোখের পরীক্ষা করতে হবে।’




