১৭ মাসে ১৪১১ রাজনৈতিক সহিংসতা, নিহত ১৯৫: এইচআরএসএস

ফাইল ছবি
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। এইচআরএসএস বলছে, এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানামুখী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক্-নির্বাচনী সহিংসতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘মব ভায়োলেন্স এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি। মব সন্ত্রাস করে বিভিন্ন অফিস আক্রমণ করা হয়েছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ছিল। মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় নাগরিক নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে জনমনে হতাশা ও উদ্বেগ বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে দেশে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ১৯৫ জন নিহত ও ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সমাবেশ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, চাঁদাবাজি ও স্থাপনা দখল এসব ঘটনার প্রধান কারণ।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭০৪টি ঘটনায় ১২১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ১৩১ জন আহত হয়েছেন।
এছাড়াও একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার ২৩৬টি ঘটনায় ১৫৬ নিহত ও ২৪৯ জন আহত হন এবং ৩০০-এর বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন, শতাধিক রাজনৈতিক কার্যালয় ও ১৩০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন পর্যন্ত তিন মাসে ১৫৫টি নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতায় নিহত ৭ ও ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৭ মাসে মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনির ৪১৩টি ঘটনায় নিহত ২৫৯ জন ও ৩১৩ জন আহত হন। সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলায় ৬ জন নিহতসহ ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এ সময়ে ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় ৪১টি মামলায় ৬৯ জন অভিযুক্ত ও ৩৩ জন গ্রেপ্তার হন। অধিকাংশ মামলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টকে কেন্দ্র করে হওয়ায় আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ও নির্যাতনে ১৭ মাসে ৬০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জন আসামির, যার মধ্যে ৪৪ জন কয়েদি ও ৮৩ জন হাজতি। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনসহ কয়েকজনের মৃত্যু ঘিরে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুলেছে তাঁদের পরিবার।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১৭টি মন্দির, ৬৩টি প্রতিমা ও ৬৫টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
দেশজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতিও ছিল উদ্বেগজনক। সীমান্তে সংঘটিত ১১০টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৩ জন বাংলাদেশি। পাশাপাশি বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে পৃথক হামলায় আরও ৩ জন নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস জানায়, এই সময়কালে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মোট ২ হাজার ৬১৭ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ১৬ জন। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৪৭৮ জন শিশু, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তোলে।
এ ছাড়া শ্রমিক নির্যাতন ও বিভিন্ন শিল্প দুর্ঘটনায় শত শত শ্রমিক নিহত ও আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
এইচআরএসএস জানায়, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ সময়কালের এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে মনিরুজ্জামানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।



