৩৪ সম্পাদকের যৌথবিবৃতি
স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ সম্পাদকীয় প্লাটফর্ম গঠনের আহ্বান

ছবি: এআই
দেশের গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও নির্ভীক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে সম্পাদকদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ সম্পাদকীয় প্ল্যাটফর্ম গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে দেশের ৩৪টি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকের সম্পাদকরা এই আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করেন, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক বলয় তৈরি করা হয়, তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়। ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গণমাধ্যমের ওপর এক ধরনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। সরকারি বিধি-নিষেধের পাশাপাশি ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সত্য প্রকাশে বিরত থাকার যে সংস্কৃতি গত দিনগুলোতে তৈরি হয়েছিল, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। এককভাবে কোনো সম্পাদকের পক্ষে এই ভয়ের দেয়াল ভাঙা সম্ভব নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তবে সম্পাদকরা যদি সমষ্টিগতভাবে দৃঢ় অবস্থান নেন, তাহলে তা প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের মধ্যে সাহস জোগাবে। জনগণের জানার অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানই পারে সংবাদকক্ষগুলোকে নির্ভীক সাংবাদিকতায় ফিরিয়ে আনতে।
বিবৃতিতে সম্পাদকরা বলেছেন, সম্পাদকদের যদি একটি শক্তিশালী ও আপসহীন ঐক্য থাকে, তাহলে মালিকপক্ষের অন্যায্য ও ব্যাবসায়িক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও তারা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবেন। একই সঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক বিভিন্ন প্রেসার গ্রুপের অন্যায্য চাপও মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
দমনমূলক আইনের বিষয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মতো বিভিন্ন দমনমূলক আইন ব্যবহার করেছে। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সরকারের সময়ে এই আইনগুলোর সংস্কার বা পূর্ণাঙ্গ বিলোপ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এসব দাবি আদায় সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সব ধারার সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সম্মিলিত ও নিয়মতান্ত্রিক চাপ। আমরা তেমন একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছি।
এতে আরও বলা হয়, সম্পাদকদের ঐক্য শুধু অধিকার আদায়ের জন্য নয়, বরং নিজেদের আত্মশুদ্ধির জন্যও প্রয়োজন। একটি ঐক্যবদ্ধ ফোরামের মাধ্যমে সাংবাদিকতার বৈশ্বিক নীতি ও নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, যেন গণমাধ্যম নিজেই নিজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে এবং কোনো রাষ্ট্রীয় বা বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না থাকে।
সম্পাদকরা দাবি করেন, বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে বিভিন্ন সংকটকালে সম্পাদকদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। আজ আবার সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের সময় এসেছে। দেশের স্বার্থে এবং গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে বাংলাদেশের সম্পাদকদের এই ঐক্য শুধু একটি জোট নয়, বরং এটি হবে মুক্ত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের এক অপরিহার্য ‘নিরাপত্তা প্রাচীর’।
এই প্রতিষ্ঠান গোষ্ঠী বিশেষের বদলে দল-মত নির্বিশেষে সব গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে থাকবে উল্লেখ করে সম্পাদকরা বলেছেন, আমরা অনৈক্যের সব পাটাতন ভেঙে এবং সংকীর্ণতা ও বিভেদের সব দেয়াল তুলে দিয়ে গণমাধ্যমের সব সম্পাদককে এক কাফেলায় শামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। অচিরেই আমরা এ ব্যাপারে সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করছি।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন শফিক রেহমান (যায়যায়দিন), মাহমুদুর রহমান (আমার দেশ), সালাহ উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর (নয়া দিগন্ত), আবদুল হাই শিকদার (যুগান্তর), আবু তাহের (বাংলাদেশ প্রতিদিন), মারুফ কামাল খান সোহেল (প্রতিদিনের বাংলাদেশ), হাসান হাফিজ (কালের কণ্ঠ), আযম মীর শহীদুল আহসান (সংগ্রাম), মোকাররম হোসেন (নিউ নেশন), আলম (ওয়াদা), সৈয়দ মেসবাহ উদ্দীন (বাংলাদেশের খবর), রেজাউল করীম লোটাস (ডেইলি সান), মোস্তফা কামাল (খবরের কাগজ), বেলায়েত হোসেন (ভোরের ডাক), ওবায়দুর রহমান শাহীন (জনতা), শহীদুল ইসলাম (মানবকন্ঠ), মো. সায়েম ফারুকী (রূপালী বাংলাদেশ), মনির হোসেন (খোলা কাগজ), ইলিয়াস খান (টাইমস অফ বাংলাদেশ), মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব (বাংলাবাজার পত্রিকা), শেখ নজরুল ইসলাম (খবর সংযোগ), আবুল কাশেম মজুমদার (ক্যাপিটাল নিউজ), ব্যারিস্টার মো. মারুফ ইব্রাহীম আকাশ (খবরপত্র), শামসুল হক দুররানি (নওরোজ), শাহাদাত হোসেন শাহীন (গণমুক্তি), আফসার উদ্দিন চৌধুরী (কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম), সোহেল মাহবুব (নতুন প্রভাত, রাজশাহী), মাহবুবা পারভিন (অনির্বাণ, খুলনা), শান্তনু ইসলাম সুমিত (লোকসমাজ, যশোর) খন্দকার মোস্তফা সরোয়ার অনু (দাবানল, রংপুর), মততাজ শিরিন ভরসা (যুগের আলো, রংপুর), আশরাফুল হক (প্রবাহ, খুলনা), মুকতাবিস উন নূর (জালালাবাদ, সিলেট), সাইফুল ইসলাম (নিউ টাইমস, ময়মনসিংহ)।




