এলপিজি নৈরাজ্য, একই এলাকায় একেক দাম
- তোয়াক্কা নেই সরকার বেঁধে দেওয়া দামের
- সিলিন্ডারপ্রতি ক্রেতাকে বাড়তি গুনতে হয় ৪০০-৬০০ টাকা
- খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন ডিস্ট্রিবিউটরকে ডিস্ট্রিবিউটরের তীর অপারেটরের দিকে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ঘটা করে তা প্রচারও করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই দামে কখনোই গ্যাস কিনতে পারেন না ক্রেতা। আর এই নৈরাজ্য খুচরা ব্যবসাতেই বেশি। দেখা গেছে, একই এলাকায় একেক দোকানি একেক ক্রেতার কাছে আলাদা দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। সোজা ভাষায় বললে, যে যেভাবে যে দামে পারছেন বিক্রি করছেন। সরকার বেঁধে দেওয়া দামের তোয়াক্কাই করছেন না তারা।
এ পরিস্থিতির জন্য ব্যবসায়ীরা একে অন্যকে দুষলেও মূলত ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতাদের কারসাজিতেই এই নৈরাজ্য বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সবশেষ গত ৪ অক্টোবর বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। একইভাবে অন্য ওজনের সিলিন্ডারের দামও বাড়ানো হয়েছে। তবে বাজারে এই দামে মিলছে না এলপিজি। সুযোগ বুঝে ক্রেতার কাছ থেকে সিলিন্ডারপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আদায় করছেন বিক্রেতা। ঢাকার বাইরে গড়ে ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার মিললেও ঢাকায় তা কিনতে হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকা দিয়ে। আবার কোম্পিানিভেদে দামেরও পার্থক্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ কোম্পানির সিলিন্ডার বাজারে পাওয়াই যাচ্ছে না।
রাজধানীর শ্যামলী আদাবরের রহমতুল্লাহ এন্টারপ্রাইজে র মালিক রহমতুল্লাহ ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম চাইলেন ২ হাজার ২০০ টাকা। একটু পাশেই মোহাম্মদপুরের রিং রোডের মোল্লা এন্টারপ্রাইজের বিক্রেতা মো. দিদার একই ওজনের এলপিজির দাম হাঁকলেন ২৪০০ টাকা। মিরপুরের পল্লবীর বাসিন্দা আব্দুল্লাহ প্রিন্স বলছিলেন, ‘শনিবার ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছি আড়াই হাজার টাকা দিয়ে।’
বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের চাপ আরও বেশি। ৩০ ও ৪৫ কেজির সিলিন্ডারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। একটি রেস্তোরাঁয় মাসে প্রায় ২০টি বড় সিলিন্ডার লাগে। প্রতিটিতে ১ হাজার ২০০ টাকা বাড়তি দিলে মাসে শুধু গ্যাস বাবদই খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার টাকা। তবে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সেখানে কোম্পানিভেদে সিলিন্ডারপ্রতি গড়ে ১০০-২০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যা ঢাকার তুলনায় কম।
এলপিজি আমদানি ও বোতলজাত করার জন্য লাইসেন্স রয়েছে ৫৮টি অপারেটরের। যাদের কাছ থেকে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করে পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতারা। সারা দেশে এমন পরিবেশকের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। যদিও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পরিবেশকের সংখ্যা ১১ হাজার। আইন অনুযায়ী বিইআরসি থেকে এদের নিবন্ধন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও হাতে গোনা ২০-২৫ জন পরিবেশক ছাড়া লাইসেন্স নেই কারোরই। আবার ১১ হাজারের বাইরে যেসব খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন, তাদেরও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেই।
সরবরাহ সংকটের কথা বলে ডিলাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরাও নিজেদের মুনাফা যোগ করে তা বিক্রি করছেন। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েও সিলিন্ডার পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা।
অতিরিক্ত দামের বিষয়ে এলপিজি অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর এবং খুচরা বিক্রেতারা একে-অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। অন্যদিকে বিইআরসি প্রতি মাসে নিয়ম রক্ষার মতো দাম নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করছে। মাঝখানে বাড়তি দাম দিয়ে সিলিন্ডার কিনছেন ভোক্তারা।
রাজধানীর কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা অভিযোগ করে বললেন, তাদের বাড়তি দাম দিয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ এলপিজি কিনতে হয়। অনেক সময় আগাম টাকা জমা দিয়েও এলপিজি পান না। এতে বিক্রি কমে গেছে, তাই বাধ্য হয়ে তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রায় একই অভিযোগ কয়েকজন ডিস্ট্রিবিউটরেরও। তাদের তীর অপারেটরদের দিকে। অবশ্য
অভিযোগকারীরা কেউই তাদের বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
বাংলাদেশ এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির অর্থ সম্পাদক এবং তাহের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবু তাহের কোরাইশী বলছিলেন, ‘মাত্র পাঁচটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করছে। এ কারণেই সংকট তৈরি হয়েছে। একেক কোম্পানির দামও একেক রকমের। আবার কোনো কোনো কোম্পানি আমাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দামও আদায় করছে।’
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক অবশ্য বললেন, এলপিজি আমদানি কমেনি। অপারেটররা সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি করছেন। তিনি বলছিলেন, ‘বেশি দামে বিক্রি না করার নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া দাম বেড়ে গেলে বিক্রি কমে যায়। ফলে অপারেটররা বাড়তি দাম নেন না।’
সবকিছুর ব্যয় বাড়লেও অপারেটররা সরকার নির্ধারিত দামেই এলপিজি বিক্রি করছেন দাবি করে তিনি বললেন, ‘যদি কেউ বাড়তি দাম নেন, তাহলে ওই ব্যবসায়ীর কাছে তো রসিদ থাকার কথা। সেটি তিনি প্রমাণ হিসেবে বিইআরসিতে জমা দিলেই তো তারা ব্যবস্থা নেবে।’ আমিরুল হক দুষলেন খুচরা বিক্রেতাদের। তার দাবি, খুচরা বিক্রি খাতেই সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
কমিশন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির তথ্য পেলে বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি জানালেন, বিভিন্ন এলাকায় অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ এলপিজি মজুদ করেছেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। শিগগির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলেও আশা তার।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ জানিয়েছে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন গ্যাস আমদানি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি খুব কমেনি। কিন্তু যথাযথ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলছিলেন, ‘মূলত বিইআরসির অদক্ষতা এবং তাদের জবাবদিহির অভাবের কারণেই এলপিজি নিয়ে এ নৈরাজ্য চলছে। তারা নিজেরাই নিজেদের আইন লঙ্ঘন করছে। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু কমিশনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।’
কমিশনকে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনেরও সংস্কার জরুরি। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ বন্ধ করে কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার মত তার।



