বদলেছে বৃষ্টির ধরন, বদলাতে হবে কৃষি মৌসুম
- বাড়ছে সেচ, বালাই নিয়ন্ত্রণের খরচ, কমছে উৎপাদন
- আগাম রোপণ করা যায় এমন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন কৃষিমন্ত্রী
- কৃষি পরিকল্পনায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দিতে চান বজলুর রশীদ
- ক্ষতি কমাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের পরামর্শ ড. মো. রফিকুল ইসলামের

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ৬ নম্বর মোমিনপুর ইউনিয়নের জয়নাল আবেদিন (৬৮)। চার দশক ধরে জড়িত কৃষিকাজের সঙ্গে। প্রতি বছর ধান চাষ করেন ৮ থেকে ১০ বিঘা জমিতে। এবারও আমন মৌসুমে ১০ বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন নানা জাতের ধান। তবে আগের মতো আর স্বস্তি নেই তার। আগে কৃষি ছিল অনেকটাই প্রকৃতিনির্ভর। এখন বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে ধানের সেচ— সবই করতে হয় গভীর কিংবা অগভীর নলকূপের পানিতে। ফলে চাষের খরচ বাড়ছে হু হু করে; কিন্তু সে অনুপাতে মিলছে না দাম।
আবহাওয়ার এ অনিশ্চয়তা তাই শুধু কৃষকের মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পরিবর্তন আসছে কৃষি সংস্কৃতিতেও। চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই কৃষি ছাড়ছেন। ভাঙছে গ্রামীণ কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো। যার প্রভাব পড়ছে সমাজ-অর্থনীতিতে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে কৃষিকে মানিয়ে নিতে এখনই বদলাতে হবে কৃষি পরিকল্পনা। শুধু নতুন নতুন ধান বা ফসলের জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না। কোন এলাকায় কোন জাত লাগবে, কখন লাগাতে হবে, কখন সেচ দিতে হবে; কিংবা কখন ধান কাটতে হবে— সবকিছুই আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিবেচনায় করতে হবে। অর্থাৎ ‘কৃষি ক্যালেন্ডার’ বদলাতে হবে আবহাওয়ার চরিত্র বুঝে।
বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের বড় অংশই বর্ষার ওপর নির্ভরশীল। আউশ থেকে আসে মোট ধানের প্রায় ৮ শতাংশ। আমন থেকে প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের মোট ধানের প্রায় ৪৬ শতাংশ উৎপাদিত হয় এই দুই মৌসুমে। ফলে বর্ষার আচরণে পরিবর্তন মানেই ধান উৎপাদনে বড় ঝুঁকি। সাম্প্রতিক আবহাওয়ার চিত্রও সে ঝুঁকি দেখাচ্ছে। এপ্রিল মাসে সাধারণত গরম বেশি থাকে। কিন্তু এবার এপ্রিলেই প্রায় ৭৬ শতাংশ বৃষ্টি হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক মাত্রার তাপপ্রবাহ দেখা যায়নি। জুনে আবার উল্টো চিত্র। বর্ষার শুরুতে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৬ শতাংশ কম হয়েছে। এরপর জুলাইয়ে অল্প সময়ে হয়েছে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি। সমস্যাটা তাই শুধু বৃষ্টি কমে যাওয়া নয়। কখন বৃষ্টি হচ্ছে এবং কতটা বৃষ্টি একসঙ্গে হচ্ছে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
দিনাজপুরের কৃষক জয়নাল আবেদিনের দাবি, আগে আমনের বীজতলা বৃষ্টির পানিতেই করা যেত; কিন্তু এখন সময়মতো বৃষ্টি হয় না। তাই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খরচও বাড়ছে। কিন্তু আগের মতো উৎপাদনও হচ্ছে না। এই কৃষকের আক্ষেপ, একসময় আবহাওয়ারও নিজস্ব একটা নিয়ম ছিল। কখন বৃষ্টি হবে, কখন খরা থাকবে— সেটির একটা ধারণা পাওয়া যেত। কিন্তু এখন সে হিসাব আর মিলছে না। বৃষ্টির চেয়ে খরাই বেশি হয়। এতে খরচ বাড়ছে; কিন্তু সে অনুপাতে ধানের দাম পাচ্ছেন না তিনি।
একই অভিজ্ঞতার কথা বলছেন বীরগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর পাল্টাপুর ইউনিয়নের কালিরহাটের চাষি আজিজার রহমান। এবারও তিনি প্রায় ৮ একর জমিতে ধান চাষ করছেন। তবে আবাদের শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছেন আবহাওয়ার কারণে। বললেন, ‘দিনে বীজতলায় বীজ ফেলেছি, রাতে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ধানের বীজ এক জায়গায় জমে গেছে। এতে শুরুতেই ক্ষতি হয়েছে।’ তার ভাষ্য, শুধু বৃষ্টি নয়, অতিরিক্ত গরমও এখন দুশ্চিন্তার কারণ। গরমে ধানে পচন দেখা দিচ্ছে, বাড়ছে মাজরা পোকার আক্রমণ। কীটনাশক ব্যবহার করেও সবসময় কাজ হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষি পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং অ্যাগ্রোমেট ল্যাবের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক ড. নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান শোনালেন আরও উদ্বেগজনক কথা। বললেন, ‘বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা, আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ধানের উৎপাদন ও উৎপাদনের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষিতে উচ্চতাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং পানির প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ধানের ফুল ফোটা, পরাগায়ন ও দানা গঠনের মতো সংবেদনশীল পর্যায়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় চিটা বৃদ্ধি, দানার ওজন কমে যাওয়া এবং ফলন হ্রাসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’ তিনি বলছেন, ‘অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত বা দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীন অবস্থায় আমন ও আউশ ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।’
বাংলাদেশের সব এলাকার মাটি ও আবহাওয়া এক নয়। তাই একধরনের ধানের জাত দিয়ে সব এলাকার ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বন্যাপ্রবণ এলাকায় দরকার পানিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে এমন জাত। খরাপ্রবণ এলাকায় দরকার কম পানিতে ফলন দিতে পারে এমন জাত। উপকূলীয় এলাকায় প্রয়োজন লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত। হাওরের জন্য প্রয়োজন গভীর পানিতে টিকে থাকতে পারে এমন জাত। এমন জাতও দরকার, যা দেরিতে রোপণ হলেও ফলন দিতে পারে। অর্থাৎ কৃষির পরিকল্পনাও হতে হবে অঞ্চলভিত্তিক।
বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত নিয়ে গবেষণা চলছে। বেশ কিছু জাতও উদ্ভাবন হয়েছে। তবে নতুন জাত উদ্ভাবনই শেষ নয়। গবেষণার মাঠে যে ফলন পাওয়া যায়, কৃষকের মাঠে সবসময় একই ফলন পাওয়া যায় না। তাই গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষকের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা মোকাবিলায় নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে সরকার গবেষণাভিত্তিক কৃষি উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। সম্প্রতি এক সভায় তিনি বলেছেন, আগামী মৌসুমে হাওর অঞ্চলের জন্য ব্রি ধান-১১৮ অবমুক্ত করা হবে। শীত সহনশীল এ জাতের ধান আগাম রোপণ ও কর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ফলে আকস্মিক বন্যার আগেই কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতে পারবেন এবং ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলামও। তিনি বললেন, দুর্যোগ দুই ধরনের—মানুষের তৈরি এবং প্রাকৃতিক। মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বা মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সহনশীল জাত ও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ফসল কাটার পর মাড়াই ও শুকানোর সময় ক্ষতি কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য কৃষিতে প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন ড. রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলছেন, ফসল কাটার সময় বন্যা হলে মাড়াই ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হয়। এতে ফসল নষ্ট হয় এবং পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতি বাড়ে। এ ধরনের ক্ষতি কমাতে ড্রায়ারসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। কৃষকদের জন্য কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও উন্নত করার বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানালেন তিনি। তার আশা, সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে আবহাওয়ার এই বৈরিতা মোকাবিলা করে উল্টো কৃষি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ জানাচ্ছেন, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে আবহাওয়ার মডেলিং ও পূর্বাভাস ব্যবস্থায়ও অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে একই সময়ে আবহাওয়ার স্বাভাবিক প্যাটার্নেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
বজলুর রশীদ বললেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আবহাওয়ার ধরনেও বড় পরিবর্তন আসছে। ফলে আগে যে ধরনের আবহাওয়া দেখা গেছে, এখন তার বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের চরম আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। মডেলিংয়ের মাধ্যমে সবক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন আগে থেকে ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
তার পরামর্শে আরও বললেন, শুধু তা-ই নয়— বৈরী আবহাওয়ার ফ্রিকোয়েন্সি বা পুনরাবৃত্তি বাড়ছে। এটি এমন একটি বিষয়, যার সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। প্রকৃতির ওপর আমরা অনেক ধরনের পরিবর্তন এনেছি। উন্নয়নের নামে যে পরিমাণ শিল্পায়ন হয়েছে, তার ফলে কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে। এর প্রভাব আবহাওয়ার ওপর পড়ছে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ধানে সীমাবদ্ধ নয়। পাট, সবজি, ফল, মাছ ও গবাদি পশুর উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ছে। কোথাও অতিবৃষ্টিতে সবজি নষ্ট হচ্ছে। কোথাও খরায় ফলন কমছে। উপকূলে বাড়ছে লবণাক্ততার চাপ। তাই কৃষি পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।



