প্রেমের শেষ দৃশ্য গ্র্যাজুয়েশনের মঞ্চে

পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন দুজন, গায়ে গ্র্যাজুয়েশনের গাউন, মাথায় একই রঙের বোনেট
বিদেশের মাটিতে স্বপ্ন বোনা, দীর্ঘ অপেক্ষা, অসংখ্য ত্যাগ আর অবশেষে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুজনের একসঙ্গে ‘ডক্টর’ হয়ে ওঠা— ড. শেখ তাসদিকুর হোসেন কৌশিক ও ড. ফারিহা হোসেনের গল্প যেন এক আধুনিক রূপকথা। তবে এই রূপকথায় ছিল না কোনো জাদু, ছিল শুধু অদম্য পরিশ্রম, ভালোবাসা আর একে অন্যের প্রতি নিঃশব্দ ভরসা।
১১ এপ্রিল ২০২৬। একটি ছবি— যা তারা হয়তো সারাজীবন আগলে রাখবেন। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন দুজন, গায়ে গ্র্যাজুয়েশনের গাউন, মাথায় একই রঙের বোনেট। এক দম্পতি, দুটি পিএইচডি, আর বহু বছরের এক যৌথ স্বপ্নের পূর্ণতা।
তাদের গল্পের শুরু কোনো গবেষণাগারে নয়, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমেও নয়। শুরুটা হয়েছিল ২০১৭ সালে, মালয়েশিয়ার কয়েকটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ থেকে বিবিএ শেষ করার পর এক কনফারেন্সে গিয়ে মনাশ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান তাসদিকুর। সেখানে তিনি জানতে পারেন পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন বিজনেস অ্যান্ড কমার্স থেকে সরাসরি পিএইচডিতে যাওয়ার সুযোগ এবং সম্পূর্ণ স্কলারশিপের সম্ভাবনার কথা। বিশ্বমানের শিক্ষা, দেশের কাছাকাছি অবস্থান আর নতুন সম্ভাবনার হাতছানি— সব মিলিয়ে তিনি আবেদন করেন এবং সুযোগও পেয়ে যান।
চেরি ফুলের নিচে হাঁটা, ঘুরে বেড়ানো, বহুদিন পর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস— সেই সফর যেন তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল, এতদূর আসার প্রতিটি কষ্টই সার্থক
অন্যদিকে ফারিহার মনাশে আসাটাও ছিল এক আশ্চর্য কাকতাল। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মাসিতে পড়াশোনা শেষ করে তিনিও এক কনফারেন্সে মালয়েশিয়া যান। কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই একদিন ঘুরতে যান মনাশ ক্যাম্পাসে। জেফরি চিয়া স্কুল অব মেডিসিন অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেসের আধুনিক ল্যাব, আন্তরিক পরিবেশ আর শিক্ষকদের উষ্ণ আচরণ তাকে মুহূর্তেই টেনে নেয়। ওই তখন থেকে কৌশিক-ফারিহা কিন্তু বন্ধনেই আবদ্ধ ছিলেন। অথচ আলাদা আলাদাভাবে দুজনই খুঁজে পেয়েছিলেন একই গন্তব্য।
দুজনই পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমায় ভর্তি হন। হাই ডিস্টিংশন নিয়ে শেষ করেন পড়াশোনা। এরপর দুজনেই পান মনাশ ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ মেরিট স্কলারশিপ— পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করার সুযোগ।
ঠিক তখনই পৃথিবী থমকে দেয় কোভিড-১৯। তাসদিকুরের গবেষণা ছিল বিজনেস স্কুলে, যেখানে ডেটা সংগ্রহ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মহামারীতে সবকিছু বন্ধ হয়ে গেলে তার গবেষণাও থেমে যায়। তবে থেমে থাকেননি তিনি। পুরো গবেষণার দিক পরিবর্তন করে নতুনভাবে শুরু করেন সিস্টেমেটিক লিটারেচার রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিস নিয়ে কাজ। পরে তার গবেষণা স্থান পায় একাডেমি অব ম্যানেজমেন্ট, ব্রিটিশ একাডেমি অব ম্যানেজমেন্ট এবং এশিয়ান একাডেমি অব ম্যানেজমেন্টের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে। তার গবেষণা প্রকাশিত হয় এবিডিসি-এ র্যাংকড জার্নালেও। যে সংকট একসময় ধ্বংস মনে হয়েছিল, সেটাই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষার অধ্যায়।
ফারিহার জন্য সময়টা ছিল আরও কঠিন। ক্যানসার গবেষণার পুরো কাজটাই নির্ভর করত ল্যাবের ওপর। আর কোভিডের কারণে সেই ল্যাব বন্ধ হয়ে যায় প্রায় দেড় বছরের জন্য। গবেষণার সময় যেন হঠাৎ করেই থেমে যায়। যখন আবার ল্যাব খুলল, তখন নিজেকে উজাড় করে দিলেন তিনি। দিনের পর দিন ১৮-১৯ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন ব্যাকটেরিয়া, সেল কালচার আর নমুনা নিয়ে।
ফারিহা পরে বলছিলেন, ‘এমনও দিন গেছে, আমরা একই বাসায় থেকেও ঠিকমতো কথা বলতে পারিনি। কিন্তু সে কখনো অভিযোগ করেনি। কখনো কখনো রাত ২-৩টা পর্যন্ত জেগে থাকত, শুধু আমাকে এক ঝলক দেখবে বলে।’
তাসদিকুর খুব সহজভাবে বললেন, ‘পিএইচডির কঠিন সময়গুলো এমন একজনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারা, যে সত্যিই বোঝে— এটাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।’
কিন্তু মহামারীই তাদের একমাত্র বাধা ছিল না। ফারিহা বড় হয়েছেন নানু-নানার স্নেহে, এক বড় যৌথ পরিবারে। বিদেশে এসে সেই পরিবারকে ছেড়ে থাকাটাই ছিল কঠিন। তার ওপর পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমার সময় মারা যান তার নানু। দেশে ফিরতে পারেননি। পিএইচডির প্রথম বছরে, যখন পৃথিবীর সীমান্ত বন্ধ, তখন হারান নানাকেও। শেষবারের মতো দেখাও হয়নি।
এরপর আসে আরেক বিপর্যয়। ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়ে তাসদিকুরের কনুই ভেঙে যায়। প্রয়োজন হয় বড় অস্ত্রোপচারের। তখন দুজনই তাদের মিড-ক্যান্ডিডেচার রিভিউয়ের চাপে। শেষ পর্যন্ত কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিতে হয়— তাসদিকুর একা দেশে ফিরে যান চিকিৎসার জন্য, আর ফারিহা থেকে যান মালয়েশিয়ায়, নিজের গবেষণা শেষ করতে। ‘সময়টা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ ক্লান্তিকর ছিল’। ফারিহা বলছিলেন, ‘তবে ওই সময়টাই আমাকে শিখিয়েছে— সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, কিন্তু আমরা ভাবার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।’
তাসদিকুরের কাছে সেই সময়ের শিক্ষা ছিল অন্য রকম। বলছিলেন, ‘গবেষণার পথ সবসময় অনিশ্চয়তায় ভরা। এমন অনেক সময় আসে, যখন মনে হয় কিছুই এগোচ্ছে না। তখন নিজেকে মনে করিয়ে দিতাম কেন শুরু করেছিলাম— নিজেকে একজন গবেষক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য, আর একদিন নিজের সমাজের জন্য কিছু করার জন্য।’
এতসব কষ্টের মধ্যেও একটি স্মৃতি আজও তাদের কাছে সবচেয়ে উজ্জ্বল। মনাশ বিজনেস স্কুলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অর্থায়নে জাপানের একটি কনফারেন্সে যাওয়ার সুযোগ পান তাসদিকুর। সঙ্গে ছিলেন ফারিহাও। চেরি ফুলের নিচে হাঁটা, ঘুরে বেড়ানো, বহুদিন পর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস— সেই সফর যেন তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল, এতদূর আসার প্রতিটি কষ্টই সার্থক।
ফারিহা বললেন, ‘সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, সব ত্যাগ, সব কষ্ট, সব নির্ঘুম রাত— সবকিছুরই একটা সুন্দর মানে আছে।’
পিএইচডি শেষ করে দুজনই দেশে ফেরেন। ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়, বরং নিজের মানুষদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে। তাসদিকুর যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। পরে যোগ দেন এএসিএসবি স্বীকৃত সানওয়ে বিজনেস স্কুলে। ফারিহা এখন ঢাকার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মাসি বিভাগের সিনিয়র লেকচারার। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার— মায়ের অনুপ্রেরণায়, যিনি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাসদিকুরের কাছে গ্র্যাজুয়েশনের আরেকটি স্মৃতি আজও গভীরভাবে স্পর্শ করে। তার প্রধান সুপারভাইজার ড. এলেইন চিউ অন্য দেশ থেকে শুধু তার গ্র্যাজুয়েশনে উপস্থিত থাকার জন্য এসেছিলেন। বললেন, ‘সেই মুহূর্তটা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘কোনো সাফল্যই একা অর্জন করা যায় না।’
তাদের গল্প আসলে শুধু দুজন মানুষের একাডেমিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি ভালোবাসা, ত্যাগ, অপেক্ষা আর একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার গল্প। হাজার মাইল দূরে থেকেও যারা একে অন্যের হাত ছাড়েননি। অনেক প্রেমের গল্প শেষ হয় বিয়ের মঞ্চে। তাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় লেখা হয়েছে গ্র্যাজুয়েশনের মঞ্চে— যেখানে তারা আর শুধু প্রেমিক-প্রেমিকা নন, দুজনই ‘ডক্টর’।





