তবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষকে টাকা ধার দেওয়া সহজ। কিন্তু ফেরত চাওয়া কঠিন। টাকা দেওয়ার সময় দুজনের মধ্যেই ব্যাপক ভালোবাসা তৈরি হয়। আর ফেরত চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের নানা হিসাব চলে আসে।
এক বন্ধু আমার কাছে টাকা ধার চাইল। দশ হাজার টাকা। বন্ধু চরম বিপদে পড়েছে। আজকেই টাকা পাঠাতে না পারলে তার বাবার অপারেশন হবে না। তাই লজ্জার মাথা খেয়ে বাধ্য হয়েই টাকা চাইছে।
আমার অবস্থাও ভালো না। টানাটানি চলছে। কিন্তু বন্ধু শতভাগ নিশ্চয়তা দিল। কথার নড়চড় হবে না। টাকাটা আগামী সপ্তাহেই দিয়ে দেবে।
আমি টাকা দিলাম। বন্ধু খুব খুশি হলো।
আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুই আসলেই প্রকৃত বন্ধু।’ তার কথা শুনে আমারও ভালো লাগল। দশ হাজার টাকা দিয়ে প্রকৃত বন্ধু হয়ে গেলাম—বিষয়টা খারাপ না।
এক সপ্তাহ পর তাকে ফোন দিলাম। আমার কণ্ঠে অনুনয়-বিনয়, ‘টাকাটা দিবি দোস্ত? যদি দিতি, খুব উপকৃত হতাম।’
তার কণ্ঠে বিরক্তি, ‘এত অস্থির হচ্ছিস কেন? দুই-এক দিনের মধ্যেই পেয়ে যাবি।’ বন্ধুর কথা শুনে মনে হলো, আমি কাউকে টাকা ধার দিইনি। বন্ধুই হয়তো আমাকে টাকা দিয়েছিল।
দুই দিন পর ফোন দিলাম। কয়েকবার। ফোন ধরল না। রাতে মেসেজ দিল, ‘একটু ব্যস্ত আছি বন্ধু। পরে কথা বলব।’
এরপর যোগাযোগ নেই কিছু দিন। ভাবলাম, সে-ই হয়তো ফোন দেবে। দিল না। একদিন রাস্তায় দেখা হয়ে গেল। সে এমনভাবে হাসল, যেন টাকা নামে কোনো বস্তু পৃথিবীতে তখনো আবিষ্কারই হয়নি।
আমি বললাম, ‘কী খবর দোস্ত?’
সে বলল, ‘ভালো। তোর?’
আমিও বলি, ‘ভালো।’
দুজনেই জানি, আমরা মুখে যা বলছি, সেটা কারও আসল বক্তন্য না। বরং মনে যা আছে সেটাই আসল। একসময় সাহস করে বললাম, ‘টাকাটা যদি একটু দিতে পারতি…’
তার কণ্ঠে আরও বিরক্তি, ‘আরে দোস্ত, মনে করিয়ে দিস না। আমি কী ভুলে গেছি নাকি! মাথায় আছে।’
আমি আর কিছু বললাম না। শুধু ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। যার টাকা ফেরত দেওয়ার কথা, তার মাথায় থাকে। শুধু টাকা থাকে না।
আরও এক মাস গেল। তারপর একদিন সে নিজেই ফোন করল। আমি ভাবলাম, টাকা দেবে। সে বলল, তোর কাছে হাজার পাঁচেক টাকা আছে? খুব ইমার্জেন্সি দরকার। কালকেই দিয়ে দেব।’
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। সে চুপ। আমিও চুপ। সেদিন প্রথমবার বুঝলাম, টাকা ধার দেওয়া মানে শুধু টাকা দেওয়া নয়। টাকার সঙ্গে নিজের একটা অংশও দিয়ে দেওয়া। তারপর সেই অংশটা ফেরত চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বারবার। লজ্জা নিয়ে। অপরাধবোধ নিয়ে।
শেষ পর্যন্ত বন্ধু টাকা ফেরত দিল। তবে অনেক দিন পর। টাকা হাতে নিয়ে আমার আনন্দ হলো না। বরং অদ্ভুত শূন্যতা বোধ করলাম। ভাবলাম, টাকা তো ফিরে এসেছে। কিন্তু আগের সেই সম্পর্কটা কি ফিরেছে? হয়তো না। টাকার সবচেয়ে অদ্ভুত ক্ষমতা সম্ভবত এটাই। টাকা হারালে টাকা ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো সম্পর্কের হিসাব একবার খুলে গেলে, সেটার খাতা আর কখনো বন্ধ হয় না।






