সুতরাং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শারাফের কষ্ট একটাই, তার বাবার টাকা এত কম কেন! বাবার কাছে খেলনা কেনার টাকা থাকেই না। অথচ খেলনাই মানব জীবনের সবচেয়ে জরুরি পণ্য। বাবা মাসে একটা কি দুইটা গাড়ি কিনে দেয়। ভাবা যায়, এ মাসে রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি কেনা হয়েছে মাত্র একটা! এত অল্প গাড়ি দিয়ে কি খেলা হয়! বাবার বুদ্ধি আসলেই অনেক কম। অন্য খেলনাও যে নেই, সেটাও দেখছে না। বাসায় বন্দুক আর পিস্তল আছে কয়েকটা, যার বেশিরভাগই নষ্ট। সুইচ দিলে ওড়ে— এমন ছোট একটা হেলিকপ্টার কিনে দিয়েছিল। সেটারও পাখা ভেঙে যাওয়ার পর আর কেনা হয়নি। সুন্দর একটা ট্রেন ছিল সবুজ রঙের। তার চাকায়ও বিরাট সমস্যা। ট্রেন ছাড়লেই অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে উল্টে যায়। দিনকাল সত্যিই খুব খারাপ যাচ্ছে। খেলনার কথা বললেই বাবা বলে, টাকা নাই, টাকা নাই।
শারাফ গালে হাত দিয়ে ভাবে, কীভাবে তার বাবার টাকা সমস্যার সমাধান করা যায়। ভেবে অবশ্য কোনো কিনারা করতে পারে না। কীভাবেইবা পারবে! সে তো ছোট মানুষ। বয়স মাত্র পাঁচ।
কোনো লাভ নেই জানে, তবু শারাফ বাবার কাছে আসে আলোচনার জন্য। বাবার চলমান অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হলো কি না জানা দরকার। শারাফ গুটিগুটি পায়ে এসে চিন্তিত গলায় বলে, ‘বাবা, তোমার সব টাকা কি শেষ?’
ছেলের কথা শুনে আমি মিটিমিটি হাসি। প্রতিদিন একই কাহিনি। হেসে জবাব দিই, ‘সব শেষ না বাবা। এখনো আছে কিছু।’
ছেলে টাকার পরিমাণ নিয়ে সন্দিহান। তাই আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘অল্প আছে নাকি বেশি?’
‘অল্প আছে বাবা।’
‘বেশি টাকা কি আবার হবে?’
‘হবে বাবা।’
‘কবে হবে? অল্প দিন না বেশি দিন পর?
‘অল্প দিন পর।’
ছেলে আমার কথায় খুব একটা ভরসা পায় না। আগে অল্প দিন পর টাকা হবে শুনে খুশি হতো। এখন বুঝে গেছে— বাবা শুধু শুধু মিথ্যা কথা বলে।
বাজার থেকে এলেই ছেলে আতঙ্কিত হয়ে পাকড়াও করে, ‘বাবা, তুমি কি বাজারে সব টাকা শেষ করে ফেলেছ?’
বলতেই হয়, ‘হ্যাঁ বাবা। সব টাকা শেষ করে ফেলেছি।’
ছেলে আমাকে শাসায়। বাজার করে টাকা শেষ করছি কেন তার কৈফিয়ত চায়। ভবিষ্যতে টাকা খরচ না করার আদেশ দিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘একটা রিমোট কন্ট্রোল গাড়ির দাম কত বাবা?’
‘মিনিমাম পাঁচশ টাকা তো হবেই।’
‘পাঁচশ টাকা কি বেশি টাকা নাকি কম টাকা?’
‘অনেক বেশি টাকা বাবা।’
অনেক বেশি শুনে ছেলে হতাশ হয়। মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। বুঝতে পারে— বেশি টাকা হলে বাবা গাড়ি কিনে দেবে না। তার বাবা কেন এমন হলো, সে ভাবতে থাকে।
বাবার টাকা কেন বাড়ে না, সেটা শারাফের কাছে রহস্য। তবে আমার কাছে রহস্যটা এত কঠিন না। টাকা খাবারে যায়। বাজারে যায়। বিলের পেছনে যায়। স্কুলের খরচে যায়।
শারাফের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। তার কাছে পাঁচশ টাকা মানে একটা রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি। আর আমার কাছে পাঁচশ টাকা— কিছু সবজি, ডিম আর কয়েকটা প্রয়োজনীয় জিনিস। একদিন ছেলে বড় হবে। নিজের টাকা হবে। তখন হয়তো সে বুঝবে, একটা খেলনা গাড়ির চেয়ে এক কেজি চাল কখনো কখনো বেশি জরুরি।






