আগামীর সময়

নাসির আলী মামুনের ৬৬তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু

নাসির আলী মামুনের ৬৬তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু

সংগৃহীত ছবি

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকায় শুরু হয়েছে নাসির আলী মামুনের ৬৬তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হয়েছে কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের বিরল প্রতিকৃতি ও মুহূর্ত। এছাড়াও উপস্থাপিত হয়েছে দুই প্রভাবশালী কবির ওপর নির্মিত সাদা-কালো প্রতিকৃতি ও আর্কাইভাল উপকরণের এক অনন্য সংগ্রহ।

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া প্রদর্শনী চলবে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত।

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন বলেছেন, ‘অসংখ্য দুর্লভ আলোকচিত্র নিয়ে 'ফটোজিয়াম' নামে একটি প্লাটফর্ম গড়েছি। এটি আমি কতদিন সংরক্ষণ করতে পারব জানি না। আমি চাই সবাই ফটোজিয়ামের পাশে এগিয়ে আসুক।’
‘নাসির আলী মামুনের মতো একজন আলোকচিত্রীর হাতে, আলোকচিত্র কেবল শিল্পচর্চার মাধ্যম নয়, বরং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হয়ে ওঠে। তাঁর সাদাকালো প্রতিকৃতিগুলো আলো ও ছায়ার অপূর্ব ব্যবহারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শারলে।

দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমানের ভাষ্য, ‘শুধু শিল্পসাহিত্য ও সৃজনশীলতার জন্যই নয়, দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্যই মুক্ত পরিবেশ ও পরমতসহিষ্ণুতা প্রয়োজন।’
শিল্পী মনিরুল ইসলাম জানান, ‘নাসির আলী মামুন দীর্ঘ দিন থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতির ছবি তুলছেন। এই কাজটি বেশ কঠিন। তিনি এ ক্ষেত্রে অর্জন করেছেন অসাধারণ সাফল্য।

মামুনের ক্যামেরায় এই দুই কবি শুধু সাহিত্যিক পরিচয়ে নয়, বরং জটিল ও গভীর মানবিক সত্তা হিসেবে ধরা পড়েছেন। শামসুর রাহমানের প্রতিকৃতিতে ধরা পড়ে এক নিঃশব্দ মননশীলতা, আর আল মাহমুদের ছবিতে ফুটে ওঠে অভিজ্ঞতা ও আত্মচিন্তায় গঠিত এক গভীর আবেগময়তা— যেখানে মর্যাদা ও নিঃসঙ্গতা পাশাপাশি অবস্থান করে।

প্রদর্শনীর একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো দুই কবির একটি ঐতিহাসিক সাক্ষাতের ভিজ্যুয়াল দলিল। দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যের পর ২০০৪ সালের ৩১ মে শ্যামলীতে শামসুর রাহমানের বাসভবনে নাসির আলী মামুনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় তাঁদের এ সাক্ষাৎ। সেই সময় ধারণকৃত আলোকচিত্র ও ভিডিও, যা পরে প্রথম আলো-তে প্রকাশিত হয়, এই প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হয়েছে—যা দর্শকদের সামনে এক বিরল সাহিত্যিক পুনর্মিলনের মুহূর্ত তুলে ধরে।প্রদর্শনীতে প্রায় ৬০টি আলোকচিত্র ও অপ্রকাশিত ভিডিও প্রদর্শিত হচ্ছে, যা তুলে ধরে সাদা-কালো আলোকচিত্রের চিরন্তন সৌন্দর্যকে। আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম ব্যবহার, সংযত বিন্যাস এবং অন্তরঙ্গ ফ্রেমিং কবিদের ব্যক্তিত্ব ও অন্তর্জগতের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে সহায়তা করে দর্শকদের।

এই প্রদর্শনী উৎসর্গ করা হয়েছে আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠ শামসুর রহমান এবং গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতায় গভীরভাবে প্রোথিত আল মাহমুদকে।

১৯৫৩ সালের ১ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী নাসির আলী মামুন বাংলাদেশের প্রতিকৃতি আলোকচিত্রের জনক হিসেবে সুপরিচিত এবং “ক্যামেরার কবি” নামে সমাদৃত। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শিল্পী, লেখক, চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সাদা-কালো প্রতিকৃতি ধারণের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ নির্মাণ করেছেন, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বহন করে বিশেষ গুরুত্ব। তিনি দেশে-বিদেশে ৬৫টি একক প্রদর্শনী করেছেন এবং রচনা করেছেন ২০টি গ্রন্থ ।
দৈনিক প্রথম আলো-এর ফটো সম্পাদক হিসেবে তাঁর ভূমিকা এবং নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত আলোকচিত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করা তাঁর পেশাগত জীবনে যোগ করেছে বিশেষ তাৎপর্য। অসংখ্য সম্মাননার মধ্যে তিনি পেয়েছেন শিল্পকলা পদক (২০১৮), বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ (২০২২) এবং একুশে পদক (২০২৫)। বর্তমানে তিনি PHOTOSEUM প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত, যা বাংলাদেশের আলোকচিত্র ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উপস্থাপনের লক্ষ্যে একটি নিবেদিত জাদুঘর হিসেবে গড়ে উঠবে। তাঁর এই উদ্যোগ আলোকচিত্রকে দেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে যথাযথ স্থান দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

    শেয়ার করুন: