ত্বকে ব্রণ, অবহেলা করলেই বাড়বে বিপদ!

ব্রণ সমস্যা সমাধানে জানা প্রয়োজন সঠিক তথ্য
বয়স ৩০ বা ৪০ পেরিয়ে গেছে, ভেবেছিলেন ব্রণের দিন বুঝি পেছনে ফেলে এসেছেন! কিন্তু এক সকালে আয়নায় তাকিয়ে দেখলেন চিবুকে একটি যন্ত্রণাদায়ক ব্রণ উঠে বসে আছে। কয়েকদিন পর চোয়ালের কাছে দেখা দিল আরও একটি। রূপচর্চা বা রুটিনে তো তেমন কোনো বদল আনেননি, তবে হঠাৎ এমনটা কেন হচ্ছে? কৈশোর পার হলেই যে ব্রণের সমস্যা পিছু ছাড়বে, এমন কোনো কথা নেই। অনেকে দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যায় ভোগেন, আবার কারও ক্ষেত্রে ৩০ বা ৪০ বছর বয়সে এসে জীবনে প্রথমবার ব্রণ দেখা দেয়। দীর্ঘদিন ত্বক একদম পরিষ্কার থাকার পর হঠাৎ এমন বিড়ম্বনায় পড়া সত্যিই বিরক্তিকর। এর কারণ সবসময় খুব স্পষ্ট হয় না। হরমোনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ, খাদ্যাভ্যাস কিংবা ব্যবহৃত মেকআপ–সবই এর পেছনে দায়ী হতে পারে। আর বারবার মুখ ধুয়ে ফেললেই যে এর সমাধান মিলবে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। ডার্মাটোলজিস্টদের মতে "বয়ঃসন্ধিকালের সঙ্গেই ব্রণ বেশি যুক্ত হলেও, ত্বকে অন্য কোনো সমস্যা না থাকলেও ৩০ ও ৪০-এর কোঠায় হুট করে ব্রণ বা 'ব্রেকআউট' হওয়া খুব স্বাভাবিক। মূলত ত্বকের লোমকূপ যখন অতিরিক্ত তেল ও মৃত কোষে বন্ধ হয়ে যায়, তখনই ব্রণের সৃষ্টি হয়। এর ফলে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয় এবং ত্বকের নিচে যন্ত্রণাদায়ক ফুসকুড়ি দেখা দেয়। কিন্তু বয়সের এই পর্যায়ে এসে কেন এমনটা ঘটছে?
আপনার হরমোনই হতে পারে এই ব্রণের নেপথ্য কারণ
চিবুক এবং চোয়ালের চারপাশে যদি বারবার ব্রণ উঠতে থাকে, তবে এর পেছনে হরমোনের ভূমিকা থাকার সম্ভাবনাই বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে ঋতুচক্র, গর্ভাবস্থা এবং পেরিমেনোপজের সময় হরমোনের তারতম্য ত্বকে তেল উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম -এর কারণেও ব্রণ হতে পারে। এছাড়াও শরীর যখন ইনসুলিনের প্রতি সঠিকভাবে সাড়া দেয় না, তখন তা হরমোনের কার্যকারিতা এবং ত্বকের তেল উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। তবে সব ব্রণই হরমোনজনিত নয়। কিন্তু এটি যদি বারবার ফিরে আসে–বিশেষ করে অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গের সাথে–তবে কেবল রূপচর্চার প্রসাধনী না বদলে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
চাপের সপ্তাহ আপনার ত্বকেও ফুটে উঠতে পারে
কাজের প্রচণ্ড চাপ, রাতের পর রাত কম ঘুম আর নিজের জন্য একটুও সময় না পাওয়া–ঠিক এমন এক মুহূর্তে দেখবেন গালের কোণে হাজির হয়েছে এক যন্ত্রণাদায়ক ব্রণ! অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরে 'কর্টিসল' নামক হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
এই কর্টিসল ত্বকে তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে প্রদাহ আরও বাড়িয়ে তোলে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শরীরের চাপ সামলানোর ক্ষমতা কমিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে নিঃসৃত কর্টিসল ত্বককে তৈলাক্ত করে তোলে এবং ব্রণকে আরও লাল ও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে। তাই কাজের চাপে যদি ত্বকে কোনো নির্দিষ্ট পরিবর্তন বা প্যাটার্ন লক্ষ্য করেন, তবে স্কিনকেয়ারের পাশাপাশি নিজের ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিনে নজর দেওয়া জরুরি।
আপনার ডায়েট কি ত্বকের ওপর প্রভাব ফেলছে?
বিকেলের কফির সাথে খাওয়া একটি পেস্ট্রিই হয়তো পরের দিনের ব্রণের জন্য পুরোপুরি দায়ী নয়, তবে কিছু নির্দিষ্ট খাওয়ার অভ্যাস অবশ্যই ব্রণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার (যেমন: সাদা রুটি, মিষ্টি পানীয় ও পেস্ট্রি) রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা ত্বকে তেল উৎপাদন বাড়ায়। এছাড়া অতিরিক্ত দুগ্ধজাত পণ্য এবং জিম করার পর ব্যবহৃত হুই প্রোটিন সাপ্লিমেন্টও অনেকের ক্ষেত্রে ব্রণের ট্রিগার হিসেবে কাজ করে বলে জানান ডা. প্রিয়াঙ্কা হেমরাজনী। তবে ব্রণ হয়েছে বলেই তড়িঘড়ি করে দুধ, পনির বা জিমের শেক খাওয়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। একেকজনের ক্ষেত্রে ট্রিগার একেক রকম হতে পারে। তাই খাদ্যাভ্যাসে বড় কোনো পরিবর্তন আনার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
আপনার স্কিনকেয়ার প্রোডাক্টগুলো কি পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে?
কখনও কখনও যে প্রসাধনী দিয়ে আপনি ব্রণ ঢাকার চেষ্টা করছেন, সেটাই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারী মেকআপ এবং অনুপযুক্ত স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট রোমকূপ বন্ধ করে দেয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'একনে কসমেটিকা'এর পাশাপাশি বাইরের ধুলোবালি ও দূষণ ত্বকের প্রতিরক্ষা স্তর দুর্বল করে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। একটু খেয়াল করে দেখুন–সম্প্রতি নতুন কোনো ফাউন্ডেশন বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার শুরু করেছেন কি? অথবা একসাথে অনেকগুলো নতুন প্রোডাক্ট ট্রাই করছেন? প্রসাধনী কেনার সময় লেবেলে 'নন-কমেডোজেনিক' লেখা আছে কিনা দেখে নিন; এই ধরনের প্রোডাক্ট লোমকূপ বন্ধ করে না। আর রাতে ঘুমানোর আগে অবশ্যই মেকআপ ভালোভাবে তুলে ফেলুন। মুখ শক্ত করে ঘষে ধোয়া বা অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশন ত্বককে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
না, আপনার মুখ যথেষ্ট পরিষ্কার নয় বলেই যে ব্রণ হচ্ছে, এমন নয়
অনেকেই মনে করেন মুখ ঠিকমতো পরিষ্কার করা হচ্ছে না বলেই হয়তো ব্রণ হচ্ছে। ফলে কড়া ফেসওয়াশ দিয়ে জোরে জোরে মুখ ঘষতে থাকেন, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে। বিশেষজ্ঞেরা বলেছেন, "প্রাপ্তবয়স্কদের ব্রণ কোনো অপরিচ্ছন্নতার লক্ষণ নয়। ঘন ঘন মুখ ঘষা বা তীব্র ক্লিনজার ব্যবহারে ত্বকে অস্বস্তি বাড়ে এবং ব্রণ ছড়িয়ে পড়ে।"
আপনার প্রতিদিনের রুটিন সহজ রাখুন। একটি মৃদু ক্লিনজার, নন-কমেডোজেনিক ময়েশ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিনই যথেষ্ট। পিম্পল খোঁটা বা গেলার অভ্যাস একদম বাদ দিন, কারণ এতে মুখে স্থায়ী দাগ বা গর্ত তৈরি হতে পারে।
কখন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত?
মাঝে মাঝে দু-একটি ব্রণ উঠলে তা নিজে থেকেই সেরে যেতে পারে। কিন্তু ব্রণ যদি যন্ত্রণাদায়ক হয়, বারবার ফিরে আসে কিংবা দাগ ফেলে যায়, তবে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
বিশেষ করে ব্রণের পাশাপাশি অনিয়মিত মাসিক কিংবা মুখে অতিরিক্ত লোমের সমাগম দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, কারণ এটি হরমোনজনিত কোনো ভেতরের সমস্যার সংকেত হতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্ক বয়সের ব্রণের কোনো একটি নির্দিষ্ট একক কারণ থাকে না। হরমোন, মানসিক চাপ কিংবা অনুপযুক্ত প্রসাধনী–সব মিলেমিশে এই সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই হঠাৎ ত্বকে পরিবর্তন দেখলে বাজারের সব ওষুধ বা ক্রিম একবারে ট্রাই না করে, একটু থমকে দাঁড়ান এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
সূত্রঃ টাইমস ইন্টারটেইনমেন্ট






