আগামীর সময়

একটি বেগুনি রঙের দিন

একটি বেগুনি রঙের দিন

প্রতীকী ছবি

প্রতিবছরের এই দিনে রাজধানীসহ সারাদেশের অফিস-আদালত, সভা-সেমিনার কিংবা রাজপথের মিছিলে তাকালে একটি বিশেষ রঙের ছড়াছড়ি চোখে পড়ে— বেগুনি। কারণ আজ ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

নারী দিবসে শাড়ি, ওড়না কিংবা ছোট একটি বেগুনি ব্যাজ পরে নারীরা ঘর থেকে বের হন। কেবল ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও এদিন বেগুনি রঙে সেজে ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল একটি রং মনে হলেও, এই বেগুনি আভার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক শতাব্দীর বেশি সময়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক কালজয়ী ইতিহাস।

নারী দিবসের সঙ্গে বেগুনি রঙের এই সখ্য মূলত বিশ শতকের শুরুতে যুক্তরাজ্যের ভোটাধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ নারীদের ভোটাধিকার আদায়ের প্রধান সংগঠন 'উইমেনস সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন' (ডব্লিউএসপিইউ) তাদের আন্দোলনের জন্য তিনটি প্রতীকী রং নির্ধারণ করে— বেগুনি, সাদা এবং সবুজ।
আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী এমেলিন পেথিক-লরেন্স এই রঙের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘বেগুনি হলো রাজকীয় রক্ত যা প্রতিটি নারীর শিরায় প্রবাহিত হয়; এটি তাদের আত্মসম্মান, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক।’

সাদা বোঝাত সততা ও আদর্শকে, আর সবুজ ছিল আগামীর নতুন দিনের আশার চিহ্ন। সেই সময় থেকেই বেগুনি রংটি নারীর আত্মমর্যাদা ও অধিকারের এক জোরালো ছবিতে পরিণত হয়।

সময়ের বিবর্তনে সাদা ও সবুজের চেয়ে বেগুনি রংটিই বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলনের মূলধারার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়।

এর বড় কারণ ছিল বেগুনির মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য। এই রঙটি তৈরি হয় লাল ও নীলের সংমিশ্রণে, যেখানে লাল সাহসিকতা ও উদ্যমকে বোঝায় আর নীল নির্দেশ করে স্থৈর্য, গভীরতা ও দূরদর্শিতাকে। নারী আন্দোলনের জন্য যে সাহস ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন ছিল, বেগুনি যেন তারই সার্থক প্রতিফলন।

১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে ক্লারা জেটকিনের উদ্যোগে বৈশ্বিক স্বীকৃতি আসার পর এই রংটি আন্দোলনের বৈশ্বিক প্রতীকে রূপ নেয়। বিশেষ করে ১৯১১ সালের নিউ ইয়র্কের ট্রায়াঙ্গেল শার্টওয়াইস্ট কারখানার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নারী শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই রঙের ব্যবহার এক শোকাবহ ও প্রতিবাদী রূপ লাভ করে।

বর্তমান সময়ে এসে বেগুনি রঙের প্রভাব কেবল পোশাকের ভাঁজে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল বিশ্বেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে নারীরা যে সংহতি প্রকাশ করেন, তার মূল সুরটিই হলো বেগুনি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এই রংটি এখন লিঙ্গ-নিরপেক্ষ এক উন্নত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার।

তারা ডিজিটাল আর্ট, ইনফোগ্রাফিক্স এবং ভিডিওর মাধ্যমে এই রংকে ব্যবহার করে সাইবার বুলিং বা ডিজিটাল বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছেন।

২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বেগুনি রংটি এখন প্রযুক্তিতে নারীর সমান অংশগ্রহণ ও ডিজিটাল সুরক্ষার দাবিকেও জোরালোভাবে তুলে ধরছে। ফলে বেগুনি এখন কেবল ঐতিহ্যের রং নয়, বরং এটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের এক ডিজিটাল বিপ্লবেরও প্রতীক।

তবে বেগুনি রঙের ব্যবহার অনেক সময় ‘পার্পল ওয়াশিং’ বা কেবল লোকদেখানো প্রচারণার ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এদিন তাদের লোগো বেগুনি করে বা কর্মীদের বেগুনি পোশাক পরতে উৎসাহিত করে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নারী কর্মীদের প্রকৃত অবস্থার পরিবর্তন হয় না। তাই আজকের দিনে সচেতন মহলের দাবি হলো, বেগুনি রঙের ব্যবহারের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীর সমান সুযোগ, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং বেতন বৈষম্য দূর করার মতো কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। রংটি তখন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হবে না, বরং তা হবে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক দৃশ্যমান মানদণ্ড। রংটির সার্থকতা তখনই ফুটে উঠবে যখন এটি পোশাকের সীমানা ছাড়িয়ে নারীর জীবনযাত্রার গুণগত মান পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে।

    শেয়ার করুন: