তোমার কাছে আমাদের চিঠি

ছবি এঁকেছেন ফারজিন
পারুল, বাউল ও ষাঁড়— মুস্তাফা মনোয়ারের গড়া তিনটি বিখ্যাত পাপেট। ‘মনের বন্ধু’র তিন বন্ধু। প্রিয় শিল্পী ভাইকে হারিয়ে তোমাদের মতো ওদেরও মন খারাপ খুব। তাই ওদের হয়ে চিঠি লিখে দিলেন অলকানন্দা রায়
পারুলের চিঠি
প্রিয় শিল্পী ভাই,
তোমার হাতের জাদু খুব মনে পড়ছে। তুমি যখনই সুতার টানে আমার হাতে একটা হালকা টান দিতে, পায়ের নূপুরগুলো আপনাআপনিই বেজে উঠত ঝুমুর ঝুমুর। আমি যখন নাচতে শুরু করতাম, তখন বাতাসও যেন তার ঝিরঝিরে চলা থামিয়ে দিয়ে আমার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। চারপাশে তখন কত রঙের যে প্রজাপতির ভিড়! মনে হতো, আমি বুঝি এই মাঠের বুক থেকে মুঠো মুঠো আনন্দ কুড়িয়ে আনছি আর সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছি।
আমি যে সুতায় বাঁধা, সে কথা তো প্রায়ই ভুলে যেতাম। তুমি যখন চাঁদ আঁকতে, আমি তখন আকাশের চাঁদটাকে খপ করে ধরার জন্য কতবার যে হাত বাড়িয়েছি! আবার পরক্ষণেই পড়ে গিয়ে গড়াগড়ি খেতাম। তখন নিজেকে মনে হতো এক টুকরো মুক্ত হাওয়া!
আর ওই বাউল আর ষাঁড় ভাই? ওদের না সামলালে চলে? বাউল ভাই যখন তার একতারা নিয়ে অন্য ভুবনে ডুবে থাকত, আমিও তখন নাচের তালে একতারার সুরে তাল মেলাতাম। আর আমাদের সেই দুষ্টু ষাঁড় ভাই! সে তো মাঝেমধ্যেই খামখেয়ালি হয়ে মুখটা গোমড়া করে বসে থাকত। আমি তখন কী করতাম, জানোই তো তুমি। ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, হাতটা ধরে আদর করে বলতাম, ‘কী হলো ষাঁড় ভাই? মুখটা এমন গোমড়া কেন?’ অমনি ষাঁড় ভাইয়ের গোমড়া মুখটা হাসি হাসি হয়ে যেত। সকালবেলা শিশির ভেজা ধানক্ষেতে আমিই তো সবার আগে দৌড়াদৌড়ি করতাম। টুনটুনি পাখির সঙ্গে গান গাইতে গাইতে কত যে সময় কেটে গেছে আমার!
মনে আছে তোমার সঙ্গে করা দুষ্টুমিগুলো? তুমি যখন ক্যানভাসে ছবি আঁকায় খুব মন দিতে, আমি চুপিচুপি তোমার সেই প্রিয় তুলি লুকিয়ে ফেলতাম! তুমি যখন হন্যে হয়ে তুলিটা খুঁজতে, আমি তখন আড়াল থেকে খিলখিল করে হেসে উঠতাম। তুমি তখন আমার দিকে তাকিয়ে সেই চেনা মিষ্টি হাসিতে বলতে, ‘কী পারুল, আজ খুব দুষ্টুমি হচ্ছে, তাই না?’
আমি তো তোমারই সৃষ্টি, শিল্পী ভাই। তোমার দেওয়া ছোট্ট একটুকরো আনন্দ। তুমি আমাকে দিয়েছ সহজ ছন্দে, সরল আনন্দে ছোটার আনন্দ। সেই আনন্দে এখনো আমি কতশত প্রশ্নে দুনিয়াটাকে জেনে নিতে চাই!
শিল্পী ভাই, তুমি যেখানেই থাকো, জেনে রেখো, যখনই আমার দিকে তাকাবে, দেখবে আমি ঠিক আগের মতোই বাউল আর ষাঁড় ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন কোনো ছন্দের অপেক্ষায় আছি।
ইতি,
তোমারই আদরের পারুল
বাউলের চিঠি
ভালোবাসার শিল্পী ভাই,
এখন আমি মাঠের ধারের ওই পুরনো বটগাছটার নিচে বসে আছি। চারদিক আজ একটু অন্যরকম, কেমন যেন তোমার মুখের মতো মায়ায় ভরা! বাউল তো আমি, গানের মানুষ, তাই গান দিয়েই তোমাকে আজ চিঠি লিখছি।
শিল্পী ভাই, আমার একতারার প্রতিটি তারে যে সুরগুলো তুমি তুলে দিয়েছিলে, সেগুলো আজও একই রকম আছে। মনে পড়ে, যখন তুমি আমার হাতের আঙুলগুলো সুতায় বেঁধে সুর তুলতে শেখাতে আর বলতে, ‘বাউল, গান মানে শুধু শব্দ নয়, গান হলো মনের কথা।’ আমি আজও সেই কথাগুলোই গেয়ে চলি। আমার এই কাঠের শরীরে কোনো রক্ত-মাংসের হাড় নেই। কিন্তু তোমার দেওয়া সেই সুর যখন বেজে ওঠে, তখন মনে হয়, আমারও প্রাণ আছে।
আমার এই একতারার টানে যে কতশত পাখি, কত টুনটুনি আর চড়ুই জড়ো হয়, তুমি তো তা জানোই! আর পারুল, মিষ্টি মেয়েটা সারাক্ষণই নাচছে আর বলছে, ‘বাউল ভাই, এই গানটা ধরো, ওই গানটা ধরো।’ অমনি আমিও গেয়ে উঠছি। সঙ্গে অভিমানী ষাঁড় ভাইও মাথা দোলাচ্ছে। জানো তো, আমি গান শুরু করলেই বাবুই পাখিরা তাদের বাসায় মাথা বের করে শিস দেয়। আমি জানি, ওরা আসলে তোমাকেই খোঁজে। ওরাও জানে, বাউলের গান মানেই তোমার সেই হাসিখুশি মুখ।
তুমি চিন্তা করো না, বাউল তার সুর হারাবে না। সে আজও সেই একই গ্রামছাড়া রাঙা মাটির পথে গান গেয়ে বেড়াবে।
ইতি,
তোমার স্নেহের বাউল
ষাঁড়ের চিঠি
আদরের শিল্পী ভাই,
জানি, চিঠি লেখার মতো লম্বা হাত আমার নেই; কিন্তু তোমার শেখানো পথে মনের কথাগুলো ঠিকই লিখে ফেলছি।
শিল্পী ভাই, লোকে আমাকে বোকা ষাঁড় বলে; কিন্তু তুমি তো জানোই, আমি মস্ত দেহের হলেও আমার মনটা কেমন কোমল! তুমি যখনই আমাকে মঞ্চে নিয়ে আসতে, আমার সেই অগোছালো হাঁটা দেখে দর্শক যে কী হাসত! জানি, ওই হাসি ফোটানোর দায়িত্বটা তুমিই আমাকে দিয়েছিলে। মনে আছে, তুমি আড়ালে থেকে যখন আমার মাথাটা একটু নিচু করে আর লেজটা নাড়িয়ে দিতে, তখন আমিও বুঝতে পারতাম, এবার একটু অভিনয় করতে হবে।
আজও আমি সেই ধানের ক্ষেতের আলে ঘুরে বেড়াই। এখন অনেক কিছু চিনি। আকাশের রামধনুর সাত রঙ চিনি। আগে আমি শুধু ঘাস আর খড়ই চিনতাম; কিন্তু এখন লাল-হলুদ ফড়িংগুলোও চিনি। এটা কিন্তু তোমারই শেখানো। সেই যে তুমি তুলি দিয়ে ফড়িং আঁকলে, তারপর আমাকে দেখালে, তখন থেকেই আমার পৃথিবীটা কত রঙিন হয়ে গেল!
তবে হ্যাঁ, একটা কথা না বললেই নয়; মাঝেমধ্যে এখনো আমার খুব দুষ্টুমি করতে ইচ্ছা করে। বাতাসে দোল খাওয়া কচি ধানের ডগাগুলো যখন নাচে, আমার বড় ইচ্ছা করে সব চিবিয়ে খাই। কিন্তু পারুল তো আছেই! ও আমাকে খুব শাসন করে। তবে তুমি যদি থাকতে, নিশ্চয়ই আমাকে বকতে না; বরং আমার পিঠ চাপড়ে দিতে। তোমার সেই হাতের স্পর্শ খুব মিস করি। যেখানেই আছো, ভালো থেকো প্রিয় শিল্পী ভাই।
ইতি,
তোমার অতি প্রিয়, দুষ্টু ষাঁড় ভাই




