টিকটকারের ফাঁদে

আঁকা: সোহানুর রহমান
টিকটকের রঙিন স্ক্রিনের কৃত্রিম আলোর ওপারেই ওত পেতে ছিল অন্ধকারের এক জগৎ। যেখানে বন্ধুত্বের মিষ্টি মোড়কে পাতা হয়েছিল নারী পাচারের ভয়াল ফাঁদ। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পৈশাচিক ও গা শিউরে ওঠা ভিডিও ক্লিপ যখন লাখ লাখ মানুষের টাইমলাইনে ভেসে বেড়াচ্ছিল, তখন ভাবতে পারেনি যে এটি শুধু একটি সাধারণ মারধরের দৃশ্য নয়; বরং দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নড়িয়ে দেওয়া এক আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের অন্ধকার পর্দার উন্মোচন। ২০২১ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, ভারতের বেঙ্গালুরুতে এক তরুণীকে চরম শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে। ভিডিওর শিকার ভুক্তভোগী তরুণী ও নির্যাতনকারী— উভয়েই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক।
টিকটকের রঙিন দুনিয়ায় তারকা বনে যাওয়ার মোহে পড়ে এবং ভালো চাকরির প্রলোভনে বিশ্বাস করে ওই তরুণী সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন ভিনদেশে, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক দুঃসহ নরক। অপরাধীরা ভেবেছিল, ভিনদেশে বসে ডিজিটাল মাধ্যমে করা এই পৈশাচিকতার কথা দেশে পৌঁছাবে না এবং ভিডিও ছড়িয়ে তারা নিজেদের অপরাধের মাত্রা জাহির করতে পারবে। কিন্তু এই একটি মাত্র ভাইরাল ভিডিওই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের। ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ ও ভারতের সাধারণ মানুষ এবং নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সূত্রে ভারতের কেরালা ও বেঙ্গালুরু রাজ্য পুলিশের সাইবার সেলের টনক নড়ে এবং তারা দ্রুত প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অপরাধীদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করতে শুরু করে। নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বেঙ্গালুরু ও কেরালার বিভিন্ন স্থানে যৌথ অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূল হোতা রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে ‘টিকটক হৃদয় বাবু’সহ তার বেশ কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। তারপর বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক রোমহর্ষক তথ্য, যা সাধারণ মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়।
তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ রাতারাতি সেলিব্রেটি হওয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে হৃদয়
ঢাকার মগবাজার এলাকার একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান রিফাদুল টিকটকের সুবাদে গড়ে তুলেছিল এক সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র। মূল টার্গেট ছিল অভাবী পরিবার বা সহজ-সরল তরুণ-তরুণী, যারা মডেলিং কিংবা টিকটকে বেশি ফলোয়ার পাওয়ার অন্ধ মোহে আচ্ছন্ন থাকত। অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে ভারতে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরি বা বিনোদন জগতে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে অবৈধ পথে সীমান্ত পার করাত এই চক্র। একবার ভারতের সেফ হাউজগুলোতে পৌঁছানোর পর তাদের জিম্মি করে ব্ল্যাকমেইল শুরু হতো, দাবি করা হতো মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ এবং বাধ্য করা হতো নানা অসামাজিক কার্যকলাপে।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ঢাকায় নির্যাতিত তরুণীর বাবা বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় মানব পাচার ও পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা করেন। পুলিশ হৃদয়ের বাসা থেকে তার জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাসনদসহ বিভিন্ন অপরাধের নথি জব্দ করে। এই চক্রের শুধু ভারতের অংশটুকুই নয়, দেশীয় বা স্থানীয় সহযোগীদের নেটওয়ার্কও অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। বাংলাদেশে থাকা এই চক্রের অন্য সদস্য ও দালালরা মূলত সহজ-সরল তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে তাদের পাসপোর্ট তৈরি করা, সীমান্ত পারাপারের অবৈধ রুট ঠিক করা এবং দেশীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখানোর কাজটি সুচারুভাবে পরিচালনা করত।
মূল হোতা হৃদয় ভারতে বসে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশে তার সহযোগী দালালরা তরুণীদের পরিবারের ওপর নজরদারি রাখা এবং কোনো ঝামেলা তৈরি হলে তা ধামাচাপা দেওয়ার কাজ করত। ভিডিও ভাইরালের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের ভেতরে থাকা এই চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে এবং বেশ কয়েকজন স্থানীয় দালাল ও সহযোগীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসে।
অপরাধের ভয়াবহতা ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারতের বিচার বিভাগ দ্রুততার সঙ্গে বিচারকাজ পরিচালনা করে। ২০২২ সালের মে মাসে কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুর একটি বিশেষ আদালত এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালত মামলার মূল অভিযুক্ত টিকটকার হৃদয়সহ সাত বাংলাদেশিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন।
রিফাদুল ইসলাম হৃদয়ের অপরাধের এই সাম্রাজ্য রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় এবং সাইবার জগতের অপব্যবহার। বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের যোগাযোগের পরিসর বাড়ালেও একশ্রেণির বিপথগামী যুবকের কাছে অপরাধের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। টিকটকার হৃদয় বাবু প্রথম দিকে ঢাকায় ছোটখাটো কিছু টিকটক গ্রুপের সঙ্গে মিশে নিজের পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু উচ্চাশা তাকে অপরাধের অন্ধকার জগতে টেনে নিয়ে যায়। সে বুঝতে পেরেছিল, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ রাতারাতি সেলিব্রেটি হওয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে।
তরুণীদের প্রথমে বেঙ্গালুরু বা কেরালার বিভিন্ন গোপন আস্তানা বা ফ্ল্যাটে আটকে রাখা হতো
এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে সে। তার চক্রের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আকর্ষণীয় অফার বা প্রলোভনের জাল বিছিয়ে রাখত। ভুক্তভোগীরা যখন তাদের মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করে ফেলত, তখন তাদের পাসপোর্ট বা অন্যান্য ব্যক্তিগত কাগজপত্র হাতিয়ে নিয়ে জিম্মি করা হতো। সীমান্ত পার করার ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে দালাল চক্রের সহায়তা নিত, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে সাহায্য করত।
ভারতের মাটিতে পা রাখার পর এই তরুণীদের ওপর নেমে আসত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের খড়্গ। তাদের প্রথমে বেঙ্গালুরু বা কেরালার বিভিন্ন গোপন আস্তানা বা ফ্ল্যাটে আটকে রাখা হতো। সেখানে দিনের পর দিন নির্যাতন চালিয়ে বাধ্য করা হতো অনৈতিক কাজে। এমনকি হৃদয় নিজে এই পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিত এবং অন্য সহযোগীদের নিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠত। ২০২১ সালের মে মাসের শেষের দিকে যে তরুণীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তিনি শুধু এই চক্রের একটি শিকার মাত্র। এর আগেও বহু তরুণীকে তারা একইভাবে পাচার করেছিল বলে পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে। ওই তরুণী যখন তাদের যেকোনো একটি অনৈতিক আদেশের প্রতিবাদ করেছিলেন কিংবা তাদের কথামতো চলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তখন তাকে চরম শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় হৃদয় ও তার সহযোগীরা। সেই শাস্তির দৃশ্য শুধু ক্যামেরাবন্দিই করা হয়নি; বরং অপরাধীরা নিজেদের শক্তি ও আধিপত্য দেখাতে ভিডিও ক্লিপ নিজেদের গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দেয়।
ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের পুলিশ বিশেষ টিম গঠন করে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অপরাধীদের অবস্থান নিশ্চিত করে। গভীর রাতে পরিচালিত সেই অভিযানে যখন পুলিশ হৃদয়ের আস্তানায় হানা দেয়, তখন তারা পালানোর চেষ্টা করলেও পুলিশের জালে আটকা পড়ে। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং বেশ কিছু আপত্তিকর ডিজিটাল কনটেন্ট উদ্ধার করা হয়, যা পরে আদালতে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
টিকটক হৃদয় বাবুর এই পতন অপরাধ জগতের এক অনিবার্য পরিণতি হলেও এটি আমাদের সমাজে কিছু গভীর ক্ষত ও প্রশ্ন রেখে গেছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রবণতা, শর্টকাট উপায়ে তারকা খ্যাতি অর্জনের অসুস্থ মানসিকতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কীভাবে তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা চোখের সামনে নিয়ে এসেছে। পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতাই হতে পারে এ ধরনের পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ দুর্গ।






