অতি প্রাকৃত
ঘুঙুরের শব্দ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘুঙুর পায়ে হেঁটে যাওয়া লোকটি কি সত্যিই কোনো পাগল? নাকি সে অস্বাভাবিক ক্ষমতাধর কেউ? লিখেছেন সোহানুর রহমান
বহু বছর আগের কথা। তখন আমাদের গ্রামের চারপাশটা ঘেরা ছিল বিশাল ও ঘন সব বাঁশঝাড়ে। গ্রামের বাইরে যাওয়ার বা ঢোকার পথ ছিল একটাই— বাঁশঝাড়ের মাঝখান দিয়ে যাওয়া একটি সরু কাঁচা রাস্তা। এ ছাড়া গ্রামের এক কোণে আলাদা করে ছিল একটি হিন্দুপাড়া। সেই বাঁশঝাড়ের একমাত্র রাস্তাটি দিয়ে চলাচলের সময় পড়ত এক পরিত্যক্ত কালীমন্দির। নীরব হওয়ায় সাধারণ মানুষ দিনের বেলাতেও ওই পথ মাড়াতে ভয় পেত।
এই ভয়ের আরেকটি কারণ ছিল এক পাগল। তার সুঠাম ও শক্তিশালী দেহ, কিন্তু কথা বলতে পারত না। এক পায়ে বাঁধা থাকত একটি ঘুঙুর। সে যখনই হাঁটত, শোনা যেত ঘুঙুরের ঝুমুর ঝুমুর শব্দ। রাস্তা দিয়ে কোনো একা পথিক যাওয়া-আসা করতে দেখলে সে হুট করে ওপর থেকে বা বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ত। সে মানুষকে কামড়ে দিত। এর মধ্যে এলো ধানের মৌসুম। দক্ষিণ অঞ্চল থেকে বহু মানুষ ধান কাটতে এলেন। গৃহস্থরা ধানক্ষেতের মাঝেই একটি ছোট ঘর তৈরি করে দিল শ্রমিকদের থাকার জন্য।
ধান কাটা প্রায় শেষের পথে। সেটা ছিল জোছনা রাত। সর্দার বললেন, ‘আজ যেহেতু চমৎকার চাঁদনি রাত, বাকি ধানটুকু আজকেই কেটে গৃহস্থের বাড়িতে পৌঁছে দিই। তাহলে কাল ভোরবেলা ঝামেলা ছাড়াই রওনা হতে পারব।’ তাই রাতের বেলাতেই তারা বাকি ধান কেটে ফেলল এবং এক শ্রমিকের মাথায় ধানের বোঝা তুলে দিয়ে বলল, ‘তুমি গিয়ে পৌঁছে দিয়ে এসো।’ ধানের বোঝা এতটাই উঁচুতে বাঁধা ছিল যে ওই শ্রমিকের পক্ষে সামনের রাস্তা দেখার সুযোগই ছিল না। ঠিক যখন সে সেই পরিত্যক্ত মন্দিরটার কাছাকাছি পৌঁছাল, হোঁচট খেয়ে ধানের বোঝাসহ আছড়ে পড়ল মাটির ওপর। তার মনে হলো, রাস্তার মাঝখানে কেউ যেন আড়াআড়িভাবে শুয়ে আছে! কোনোমতে ধানের বোঝা সামলে সে যখন ঘামতে ঘামতে পেছনে ফিরে তাকাল, রক্ত হিম হয়ে এলো। কুচকুচে কালো সুঠাম দেহের এক মানুষ ধড়ফড় করে উঠে বসেছে মাটিতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাগলটা তার হাতের ওপরের অংশে খুব শক্ত করে কামড় বসিয়ে দিল! ব্যথায় সেই শ্রমিক এক বিকট আর্তনাদ করল। সর্দার ও অন্যান্য শ্রমিক দৌড়ে এসে দেখে, রাস্তার ওপর ধানের বোঝা পড়ে আছে আর ওই লোকটা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে তাকে গ্রামের গৃহস্থ বাড়ির কাছাকাছি নিয়ে আসা হলো। আহত শ্রমিককে নিয়ে সেই রাতেই তারা জিনিসপত্র গুছিয়ে গ্রাম ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন।
গ্রামবাসী পড়ে গেল এক গভীর আতঙ্কে। রাত নামলেই চারপাশ কাঁপিয়ে বেজে উঠত সেই পরিচিত ধ্বনি— ঝুমুর... ঝুমুর... ঘুঙুরের শব্দ। এরমধ্যেই হিন্দুপাড়ার এক প্রবীণ মারা গেলেন। দাহ করার জন্য শ্মশানযাত্রীরা লাশ নিয়ে খাটিয়ায় করে গ্রামের বাইরের শ্মশানের দিকে রওনা হলেন। যখন কালীমন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছালেন— হঠাৎ ওপরে বাঁশঝাড়ের ডাল থেকে বিকট শব্দে কিছু একটা সোজা গিয়ে পড়ল ওই লাশের ওপর! খাটিয়াসহ সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। ভয়ের চোটে যে যেদিকে পারলেন ছুটলেন। যারা পেছন ফিরে একপলক তাকানোর সাহস পেয়েছিলেন, তারা দেখলেন— পাগলটা লাশের ওপর চেপে বসে আছে!
পরদিন ভোরে সাহস করে যখন কয়েকজন সেখানে গেল, দেখল সেই লাশটার গলা ও মুখের আশপাশের মাংস খুবলে ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া হয়েছে। এবার গ্রামবাসীরা পাগলের বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত করার সিদ্ধান্ত নিল। এর মধ্যে বর্ষা এলো। চারপাশে থইথই জল, শুধু সেই বাঁশঝাড়ের রাস্তাটিই তখনো কিছুটা শুকনো ছিল। গ্রামের যুবকরা লাঠি, বল্লম ও দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দলবেঁধে বেরিয়ে পড়ল। হঠাৎ ভেসে এলো সেই পরিচিত অভিশপ্ত শব্দ— ঝুমুর... ঝুমুর... ঘুঙুরের আওয়াজ। ছায়ার মতো বেরিয়ে এসে পাগলটা একজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওই যুবক হাতে থাকা ধারালো দা বা বঁটি দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করল এবং অন্ধকারে এলোপাতাড়ি কোপ বসল পাগলের ঘাড়ে! মুহূর্তের মধ্যে পাগলের গলাটা একপাশে কাত হয়ে ঝুলে পড়ল, আর ঘাড়ের কাটা অংশ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চিরতরে নিস্তেজ হয়ে গেল। গ্রামবাসীরা মন্দিরটার পাশেই মাটি খুঁড়ে তার লাশটা কোনোমতে চাপা দিয়ে দিল। তারপর একদিন মধ্যরাতে পুরো গ্রাম আবার কেঁপে উঠল ঝুমুর... ঝুমুর... ঘুঙুরের শব্দে! মৃত মানুষ কীভাবে ফিরে আসে?
সে সময় আমার দাদা জরুরি কাজে কুমিল্লায় ছিলেন। ফিরবার সময় যখন গ্রামের সীমানায় এসে পৌঁছালেন, ততক্ষণে গভীর রাত হয়ে গেছে। কালীমন্দিরের কাছে পৌঁছাতেই পেছনে সেই চিরচেনা শব্দটা ভেসে এলো— ঝুমুর... ঝুমুর...। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখেন অন্ধকারে কুচকুচে কালো সুঠাম দেহের এক অবয়ব, যার গলাটা সামনে ঝুলে আছে— ঠিক তার পেছনেই ধেয়ে আসছে! কোনোমতে দৌড়ে যখন তিনি বাড়ির সীমানা পার হয়ে উঠানে এসে উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন, তখনই ভেতর থেকে ঘরের দরজা খুলে গেল। টর্চের আলো নিয়ে সবাই বাইরে বেরিয়ে এলো। আর সেই আলোয় তারা দূরে একমুহূর্তের জন্য দেখতে পেল— গ্রামের সীমানার মুখে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর অবয়ব, আর গলার সামনে কাপড়ের পুঁটলির মতো ঝুলছে কাটা মাথাটা! পরমুহূর্তে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস বইল, আর সেই ঘুঙুরের ঝুমুর শব্দ অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে গেল। এরপর আর কখনো ওই ঘুঙুরের শব্দ শোনা যায়নি, পাগলকেও দেখা যায়নি।






