দোয়েলের নিচে বিচিত্র জীবন

দোয়েলের নিচে বাস দুজন মানুষের। ছবি: সামিয়া পারভীন
দোয়েল চত্বর ঢাকার পরিচিত জায়গাগুলোর একটি। তবে এখানকার ফোয়ারার দিকে তাকিয়ে কেইবা ভেবেছিল, দোয়েল ভাস্কর্যগুলোর নিচে বাস করেন দুজন মানুষ। লিখেছেন মাহমুদ নেওয়াজ জয়
দোয়েল চত্বরের দোয়েলের নিচে দুজন মানুষ বসবাস করেন— এ খবরটা জানার পর কৌতূহল থেকেই সোমবার সকালে খোঁজ নিতে গেলাম তাদের। গিয়ে আবিষ্কার করলাম, ঘটনা সত্য। একজনের নাম তোতা মিয়া। আরেকজন মো. শাহীন আলম। তোতা মিয়া এখানে আছেন ১৬ বছর ধরে। তিনি আর শাহীন আলম ফোয়ারা ও চত্বর দেখভালের কাজ করেন।
তোতা মিয়ার বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় আর শাহীন আলমের রাজবাড়ীর পাংশা থানায়। মোটর চালু করা, বন্ধ করার দায়িত্বও তাদের। সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করতে হয়। ‘ফোয়ারা বন্ধ থাকলেও আমাদের কাজ থাকে। রক্ষণাবেক্ষণে দিনে অন্তত আট-দশ ঘণ্টা ব্যয় করতে হয়।’ বলেন তোতা মিয়া। ফোয়ারার পাশের এই জায়গাটুকুই তাদের ঘর। যে জায়গার পাশ দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ হেঁটে যান, ছবি তোলেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন— সেই জায়গাতেই তাদের বসবাস।
‘গত ১৩ বছরে ঢাকায় মানুষ বাড়ছে, গাড়িঘোড়া বাড়ছে, শব্দ বাড়ছে, আর বাড়ছে ধুলা,’ বলেন শাহীন আলম।
দোয়েল চত্বর ভাস্কর্য ও এর ফোয়ারার রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভালের দায়িত্ব ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। এই দুজন মানুষ সিটি করপোরেশনের হয়ে রক্ষাণাবেক্ষণের কাজটি করেন। দুজন মানুষের থাকার জায়গাটুকুতে চোখ বুলিয়ে দেখি, খুব বেশি কিছু নেই। একটা ছোট চৌকি, একটা চেয়ার, একটা বালতি, কাপড় নেড়ে দেওয়ার দড়ি আর তাতে এক-দুটো হ্যাঙ্গার। যে চৌকিতে রাতে ঘুমান, সেটাই হয়তো দিনে বসার জায়গা। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য আছে শিশু একাডেমির শৌচাগার আর খাবার বাইরে খেয়ে নেন। খোলা আকাশের নিচে থাকার কষ্ট সব ঋতুতেই। ‘শীতের সময় বাতাসে কিছুটা কষ্ট হয়। এখন যেমন মশার কষ্ট। প্রচণ্ড গরমের দিনেও একটু কষ্ট হয়,’ বলেন তোতা মিয়া। দেয়াল নেই, ছাদ নেই, তাই শীত, গরম, মশা— কোনোটা থেকেই আড়াল নেই। আর বৃষ্টি নামলে? ‘বৃষ্টির দিনে আশপাশ থেকে পানি আসে। তখন গা-মাথা ঢেকে থাকি,’ বলেন শাহীন আলম।
স্ত্রী-সন্তানদের থেকে দূরে থাকা, ছুটিছাটায় বাড়ি ফেরা, আবার ফিরে আসা— এই চক্রের মধ্যেই জীবন। ‘পরিবারের সঙ্গে কয়েক মাসে একবার দেখা হয়। ছুটি থাকলে আর ঈদের সময় বাড়ি যাই,’ বলেন তোতা মিয়া।
এখন আমার কাছে দোয়েল চত্বরকে আর আগের মতো শুধু একটা মোড় বলে মনে হয় না। মনে হয়, এটি দুজন মানুষের ঠিকানাও।



