বন্ধুদের স্মৃতিতে

বন্ধুদের সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বাঁ থেকে তৃতীয়)
রাত তখন গভীর। ঠাকুরগাঁওয়ের বলাকা সিনেমা হলের মঞ্চে দর্শক নেই; নেই কোনো ঝলমলে আলোও। অথচ কয়েকজন তরুণ ব্যস্ত। কেউ মঞ্চ পরিষ্কার করছেন, কেউ ড্রপসিন বানাচ্ছেন, কেউ আলো বসাচ্ছেন। তাদের একজনকে ক্লান্ত যেন মোটেই স্পর্শ করছে না। নির্দেশনা দিচ্ছেন, কাজ দেখছেন, প্রয়োজনে নিজেও হাত লাগাচ্ছেন। তখনো তিনি রাজনীতির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নন। তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের ‘আলমগীর ভাই’। নাটকের মানুষ, আবৃত্তির মানুষ, খেলাধুলার মানুষ, বন্ধুদের আড্ডার মানুষ।
মির্জা ফখরুলের স্কুলজীবনের বন্ধু অধ্যাপক মনতোষ কুমার দের স্মৃতিতে সেই সময়ের ফখরুল যেন একেবারেই অন্য মানুষ। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়েছেন তারা। বন্ধুমহলে ছিল দুষ্টুমি, হাসি-ঠাট্টা আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। বন্ধু গোফরানের সঙ্গে মির্জা ফখরুলদের দুষ্টুমিরও শেষ ছিল না। গোফরান প্রধান শিক্ষক রুস্তম আলী স্যারের কাছে নালিশও করতেন। একদিন সেই নালিশের পর সবাইকে ডেকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হলো। শাস্তি হিসেবে জুটল বেতের বাড়ি।
মনতোষের একটি বাক্য যেন পুরো মানুষটিকে এক ফ্রেমে এনে দেয়, ‘আলমগীর একটা বাদশা। বাদশার মতো হৃদয় তার।’
ঠাকুরগাঁওয়ের পুরনো বন্ধুদের কাছে তিনি আলমগীর। মির্জা ফখরুলের সাংস্কৃতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি ছিল নাটক। বীর মুক্তিযোদ্ধা রূপকুমার গুহঠাকুরতার স্মৃতিতে, “ঠাকুরগাঁওয়ের নাট্যচর্চায় আধুনিকতার নতুন দরজা খুলেছিলেন আলমগীর ভাই। বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটক দিয়ে পুরনো ধারার বাইরে নতুন নাট্যচর্চার সূচনা করেন তিনি। এরপর ‘মন্ত্রী হব’, ‘অন্ধকারের নিচে সূর্য’, ‘চারিদিকে যুদ্ধ’সহ বিভিন্ন নাটকে অভিনয় ও নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”
রূপকুমার জানালেন, মির্জা ফখরুল সবার আগে এসে মঞ্চে বসে থাকতেন। অন্যরা পরে এসে তার সঙ্গে যোগ দিতেন।
একবার একটি নাটক শেষ করে প্রায় ২০-২৫ জনের দল নিয়ে তারা তেঁতুলিয়ায় গিয়েছিলেন সূর্যোদয় দেখতে। সারা রাত তাস, কবিতা, গল্প আর নাটকে কেটে গেল। কিন্তু সূর্য ওঠার সময় সবাই ঘুমে!
সকালে ঘুম ভাঙার পর শুরু হলো চিৎকার— ‘সূর্য তো উঠে যাচ্ছে, সূর্যোদয় দেখবি না?’
বহু বছর পরও সেই ঘটনা মনে পড়লে হাসেন আনিসুল হক চৌধুরী।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তের জন্মজয়ন্তীতে শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠান, তরুণদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, নাটক ও খেলাধুলার আয়োজন— সবক্ষেত্রেই ফখরুলের ছিল সক্রিয়তা। রূপকুমারের ভাষায়, তিনি শুধু নাট্যকর্মী নয়, ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের সাহিত্য-সংস্কৃতির একজন প্রাণপুরুষ।






