আব্বু

বাবা মির্জা ফখরুলের কোলে বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ। ছবি: সংগৃহীত
আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। স্কুলে আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। স্কুল বাসার একদম কাছেই। তাই আমাদের আবৃত্তির শব্দ মাইকের কারণে পুরো বাড়িতে, এমনকি আশপাশেও শোনা যাচ্ছিল। আমি আবৃত্তি করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিততে পারিনি। মনটা খারাপ ছিল। প্রতিযোগিতা শেষে বাড়ি ফিরে দেখি, আব্বু বারান্দায় বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
‘কেমন হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলেন না। আমাকে সান্ত্বনা দিলেন না। আবার মিথ্যা করে ‘ভালো হয়েছে’ বললেন না।
তার মুখের দিকে তাকিয়েই আমি বুঝে গেলাম— আব্বু আমার আবৃত্তি পছন্দ করেননি।
সেদিন বুঝেছিলাম, আব্বু এমন একজন মানুষ, যিনি খুশি করার জন্য মিথ্যা কথা বলেন না।
ভালো করলে বলতেন, ভালো হয়েছে। খারাপ করলে সেটিও বুঝিয়ে দিতেন। কখনো শুধু আমার মন ভালো করার জন্য আমাকে এমন কিছু বলতেন না, যা সত্যি নয়।
সারা জীবন তাকে কাছ থেকে দেখে আমার মনে হয়েছে, সত্য কথা বলা এবং নিজের জায়গায় সৎ থাকা তার পারসোনালিটির একটা ফিচার।
মানুষ তাকে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে চেনে। আমি চিনি বাবা হিসেবে। তারপর ধীরে ধীরে বুঝেছি, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সবচেয়ে বড় শক্তিও এই সততা।
আব্বুকে আমি কখনো নিজের সুবিধার জন্য সহজ পথ বেছে নিতে দেখিনি। কোনো শর্টকাট নয়। তার রাজনৈতিক জীবনে অনেক কঠিন সময় এসেছে। মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেলে থেকেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও আব্বুকে আমি তার নিজের জন্য অভিযোগ করতে দেখিনি। তিনি আমাদেরও শিখিয়েছেন, জীবনে সবসময় নিজের সুবিধা দেখলে হবে না। নিজের গণ্ডির বাইরে একটা বিশাল পৃথিবী আছে, একটা সমাজ আছে, একটা দেশ আছে। নিজের বিশ্বাস এবং বিবেকের কাছেও সৎ থাকতে হয়।
আমি ওই ঘটনার সাত বছর পর ক্লাস টেনে ঢাকায় ইন্টারস্কুল অবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলাম। সেদিন হয়তো তিনি জানতেন না, কিন্তু আমি তার কাছ থেকে জীবনের একটি বড় শিক্ষা পেয়েছিলাম— সত্যিকারের ভালোবাসা মানে সবসময় প্রশংসা করা নয়; কখনো কখনো সত্যিটা বুঝিয়ে দেওয়াও ভালোবাসা।
আমি তার যে গুণটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি গর্ব করি, সেটি তার ইন্টিগ্রিটি।
লেখক: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় মেয়ে







