এখনো তিনি স্যার

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত
সামনে দাঁড়ানো শিক্ষকটি পাঠ্যবইয়ের কোনো একটি বিষয় দিয়ে আলোচনা শুরু করতেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ছাত্ররা বুঝতে পারত, অর্থনীতির কোনো তত্ত্ব থেকে আলোচনা চলে যাচ্ছে মানুষের জীবন, সমাজ, বৈষম্য, কর্মসংস্থান কিংবা রাষ্ট্রের বাস্তবতায়। সেই শিক্ষক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তখন তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের অর্থনীতির শিক্ষক।
বহু বছর পেরিয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষ বদলেছে, ছাত্ররা ছড়িয়ে পড়েছেন নানা পেশায়। আর সেই শিক্ষক পেরিয়ে এসেছেন দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ। আজ তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের ছাত্রদের স্মৃতিতে তার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ পরিচয়— স্যার, সেটি বদলায়নি।
ঠাকুরগাঁও বারের সভাপতি আইনজীবী ইউসুফ আলী সেই ছাত্রদের একজন। বহু বছর পরও মির্জা ফখরুলের সঙ্গে তার সম্পর্কের উষ্ণতা এতটুকু কমেনি। কিছুদিন আগে দেখা হওয়ার সময় মির্জা ফখরুল তাকে দেখে বলেছিলেন, ‘ওই যে আমার প্রিয় ছাত্র ইসু আসতেছে।’
শুধু পড়ানোর ক্ষেত্রেই নয়, ছাত্রদের সঙ্গে আচরণেও ছিল ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আলাদা বৈশিষ্ট্য। ভুল করলে রূঢ়ভাবে বকাঝকা না করে বুঝিয়ে বলতেন। শাসনের মধ্যেও থাকত আন্তরিকতা।
মো. মাজেদুর রহমান মিরুও ছিলেন মির্জা ফখরুলের ছাত্র। বর্তমানে নিজেও শিক্ষকতা করছেন। মিরুর স্মৃতিতে ফখরুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, অর্থনীতির তত্ত্বকে তিনি টেনে আনতেন সমাজ ও বাস্তব জীবনের আলোচনায়।
মিরুর স্মৃতি অনুযায়ী, তার ক্লাসে ৯০-৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকত।
শিক্ষক মির্জা ফখরুলের প্রভাব শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাসভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে একবার ছাত্রদের আন্দোলন উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কয়েকজন ছাত্র আহত হন। তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগও নিয়েছিলেন ফখরুল। এমন স্মৃতিও রয়েছে মিরুর।
কখনো কখনো ক্লাস শেষে নাটকের সংলাপও বলতেন তিনি। ছাত্ররা অপেক্ষা করত সেই মুহূর্তটির জন্যও।
প্রফেসর মোহাম্মদ আতাউর রহমান দীর্ঘদিন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। মির্জা ফখরুলের সঙ্গে তার পরিচয় সহকর্মী হিসেবে।
আতাউর রহমানের কাছে মির্জা ফখরুলের একটি আচরণ আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়। সমবয়সী হওয়া সত্ত্বেও তাকে কখনো ‘আতাউর সাহেব’ বলে ডাকেননি ফখরুল।
সবসময় বলেছেন— ‘স্যার’।
রাজনীতিতে যাওয়ার পরও সেই সম্বোধন বদলায়নি। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকার সময়ও দূর থেকে তাকে দেখলে গাড়ির জানালা খুলে হাত নেড়ে অভিবাদন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে প্রফেসর চৌধুরী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ছিলেন গণিতের শিক্ষক এবং একসময় ঠাকুরগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ। মির্জা ফখরুলের সঙ্গে একই কলেজে সহকর্মী ছিলেন। তার স্মৃতিতে ফখরুল শুধু শিক্ষক ও ছাত্রদের কাছেই জনপ্রিয় ছিলেন না। কলেজের পিয়ন-কর্মচারীরাও তাকে আপন মানুষ মনে করতেন।
কারণ, তিনি তাদের কাউকে ছোট করে দেখতেন না। সবাইকে ডাকতেন— ‘ভাই’।
আর তাই কয়েক দশক পরও তিনি সকলের কাছে— ‘স্যার’ই রয়ে গেছেন।






