ফ্লুইড ব্যালান্স ঠিক না থাকলে কিডনি হবে বিকল

আমাদের শরীরে কিডনির প্রধান কাজ শরীরে পানির ভারসাম্য ঠিক রাখা। এর পাশাপাশি ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্ত তৈরি, অ্যাসিড-ফ্লুইড ব্যালান্স ঠিক রাখার কাজটিও তার। শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি থাকলে কিডনির কার্যক্ষমতা ঠিক থাকে। এর নিচে নামলেই তৈরি হয় পানিশূন্যতা। এতে কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ কার্যক্ষমতা হারানো শুরু করে। ফলে গরমের দিনে এসব নিয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয়।
রোগের ধরন
কিডনি রোগ সাধারণত দুই ধরনের আকস্মিক এবং দীর্ঘমেয়াদি। কিডনি রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দুটি— ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন।
দীর্ঘদিন ধরে শরীরে পানির ভারসাম্য মেনে না চললে কিডনি রোগ দেখা দেয়। চিকিৎসা না করানো হলে সেটি দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তি তৈরি করে। গ্রামগঞ্জে কৃষক ও শ্রমিকদের আমরা রোগী হিসেবে পাই। তারা শরীর নিয়ে সচেতন নন, ফলে যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন, তখন ক্রনিক পর্যায়ে চলে যায় সমস্যাগুলো। এ থেকে বাঁচতে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলাই যথেষ্ট। আর আকস্মিক কিডনি রোগ থেকে বাঁচতে দরকার নিয়মতান্ত্রিক জীবন।
শরীরে দরকার পানির ভারসাম্য
একজন সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন অন্তত দেড় থেকে দুই লিটার পানি পান করতে হবে। অতিরিক্ত ঘামলে পানি গ্রহণের পরিমাণ সামান্য বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু তিন লিটারের বেশি খেতে বারণ করি আমরা। অনেকেই আছেন প্রস্রাবের ভয়ে বাইরে বের হলে পানি পান করেন না এবং প্রস্রাব চেপে রাখেন। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকলে ইউরিন ইনফেকশন তো হয়ই, পাশাপাশি ব্লাডারের মূত্র ধারণক্ষমতা বেড়ে যেতে পারে। এসব কারণে নষ্ট হতে পারে আপনার শরীরে ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য।
দিনের পর দিন পর্যাপ্ত পানি পান না করলে ইউরিন ইনফেকশন তো হয়ই, পাশাপাশি প্রস্রাব চেপে রাখলে ব্লাডারের মূত্র ধারণক্ষমতা বেড়ে যেতে পারে। এসব কারণে নষ্ট হয় শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য
গরমের মধ্যে যারা দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকতে বাধ্য হন, ফিল্ডওয়ার্ক করেন, সেলস ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন এবং কৃষক-শ্রমিকরা দিনে একটি খাবার স্যালাইন পানিতে মিশিয়ে পান করবেন। অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া পানি ও খনিজের ভারসাম্য রক্ষা করবে এটি। আপনার এই সাধারণ অভ্যাস হাঁসফাঁস লাগা, হিটস্ট্রোক ও আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়া প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
ডায়রিয়াও হতে পারে বিপদের কারণ
একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া হলে প্রথম দু-এক ঘণ্টা কিডনি নিজ থেকেই সামলে নিতে পারেন। কিন্তু ডায়রিয়া চলমান থাকলে ছয় ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি ফ্লুইড ব্যালান্স ঠিক করা না হয়, তাহলে আকস্মিক কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে আইভি ফ্লুইড অথবা ওরাল ফ্লুইড দিতে পারলে কিডনি কার্যক্ষম হতে পারে। কিন্তু দেরি করলে বাড়ে বিপদ। এ ছাড়া দেখা দিতে পারে আরও কিছু সমস্যা—
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
ক্রিয়েটিনিন বেড়ে যাওয়া
দীর্ঘমেয়াদি কিডনির সমস্যা
তরুণদের জন্য সতর্কতা
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর পরিবার থেকে দূরে বিশ্ববিদ্যালয় হলে উঠতে বাধ্য হন তরুণ-তরুণীরা। সেখানে অবাধ স্বাধীনতার কারণে কিংবা নানা বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে গিয়ে তারা নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে উদাসীন হয়ে পড়েন। প্রতিবেলার খাওয়া-দাওয়া এবং পানি পানের প্রতি ভীষণ অনিয়ম করেন। তাদের বয়স হয় ১৯ থেকে ২৫। মানবজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল বয়সে আমাদের তরুণরা এসব অনিয়মের চক্রে আটকে স্বাস্থ্যের স্থায়ী ক্ষতি করে বসেন। তাদের অনেকেই পানির চেয়ে বেভারেজ খান বেশি। ফলে একে তো পানির মতো নিউট্রাল তরল থেকে শরীরকে বঞ্চিত করে, অন্যদিকে খাওয়া-দাওয়া না করায় তারা তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার হয়ে থাকেন। তার ওপর তাদের হাতে হাতে আছে ডিভাইস। কম্পিউটার ও মোবাইল ব্যবহারের চক্করে স্বাভাবিক ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতিও বুঝতে পারেন না অনেকে। অনেকেই আছেন, যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকেন বলে পানি গ্রহণের মাত্রা কম। তাদেরও বিপদ হতে পারে।
ডায়াবেটিস ও ক্রনিক কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে
ডায়াবেটিসের রোগীরা গরমে খুব নাজুক অবস্থায় থাকে। গরমে ঘাম বেশি হওয়া তাদের জন্য আরও বিপজ্জনক। এটি ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। বিশেষত, সোডিয়াম ক্লোরাইড লস হলে এটি সাংঘাতিক ঝুঁকি তৈরি করে। ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া পানি ও খনিজ লবণের কারণে হতে পারে হিটস্ট্রোকও। এ কারণে ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য ছায়ায় থাকা বাধ্যতামূলক। বাইরে বের হতে গেলে তাকে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করতে হবে।
কিডনি রোগীরা তাদের রোগের মাত্রা অনুযায়ী নেফ্রোলজিস্টের কাছ থেকে ডায়েট চার্ট করে নেবেন এবং সে অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া ও জীবনযাপন করবেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কিডনি ফাংশনের ওপর ভিত্তি করে ফ্লুইড গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়। সেটি মেনে চলা প্রয়োজন।







