ঘাড় থেকে হাতে ব্যথা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘাড় থেকে হাতে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা সবসময় সাধারণ ঘাড়ব্যথা নয়। পেশিতে টান, ভুল ভঙ্গি, বয়স বৃদ্ধি কিংবা ঘাড়ের স্নায়ুতে চাপও এর কারণ হতে পারে। লিখেছেন ড. মো. আবু তালহা
মাথার নিচ থেকে কাঁধের ওপর পর্যন্ত ঘাড়ের যেকোনো অংশে অস্বস্তি, শক্ত হয়ে যাওয়া বা ব্যথা হলে সেটাই ঘাড়ব্যথা। এই ব্যথা অনেক সময় ঘাড় থেকে কাঁধ হয়ে হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। কখনো ব্যথার পরিবর্তে হাত বা আঙুলে ঝিনঝিন, জ্বালাপোড়া কিংবা অবশ ভাবও হতে পারে। এ ধরনের সমস্যাকে সারভাইক্যাল রেডিকুলোপ্যাথি বলা হয়।
অনেকে ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা হলে মনে করেন, এটি উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যার লক্ষণ। সাধারণত ঘাড়ব্যথা উচ্চ রক্তচাপের সরাসরি লক্ষণ নয়। তবে অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে রক্তচাপ বাড়লে বা পেশিতে টান তৈরি হলে ঘাড়ে অস্বস্তি হতে পারে।
ঘাড়ব্যথার কারণ: ঘাড়ব্যথার অন্যতম কারণ পেশিতে টান। ভুলভাবে ঘুমানো, অতিরিক্ত কাজ কিংবা হঠাৎ ঘাড় ঘোরানোর কারণে এমনটি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ঝুঁকে মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার ব্যবহার করলেও ঘাড়ে চাপ পড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঘাড়ের হাড় বা ডিস্ক ক্ষয় হয়ে সারভাইক্যাল স্পন্ডালাইটিস হতে পারে। আবার ঘাড়ের কোনো স্নায়ুতে চাপ পড়লে ব্যথা হাত বা আঙুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। মানসিক চাপের কারণেও ঘাড়ের পেশি শক্ত হয়ে ব্যথা হতে পারে।
কখন সতর্ক হবেন: ঘাড়ে অসহ্য ব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, হাতে বা আঙুলে অবশ ভাব, সুচ ফোটার মতো অনুভূতি কিংবা দুর্বলতা দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এ সমস্যায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, অর্থোপেডিক সার্জন, নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ, নিউরোসার্জন, ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ ও চিকিৎসা দিতে পারেন।
চিকিৎসা: প্রথমেই অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে বাড়িতে গরম বা ঠান্ডা সেঁক নিতে পারেন। ব্যথা বেশি হলে অল্প সময়ের জন্য সারভাইক্যাল কলার ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানুয়াল ট্রাকশন, সারভাইক্যাল ট্রাকশন, ইলেকট্রোথেরাপি, থেরাপিউটিক আলট্রাসাউন্ড, লেজারথেরাপি, ড্রাই নিডিলিং বা শক ওয়েভথেরাপি দিতে পারেন।
রোগীর অবস্থা বুঝে ব্যথানাশক ওষুধ, মাংসপেশি শিথিলকারী ও নিউরো ভিটামিনও ব্যবহার করা যেতে পারে। আইসোমেট্রিক নেক মাসল শক্ত করার ব্যায়াম ও মোবিলাইজিং এক্সারসাইজ করা যায়। তবে এসব ব্যায়াম অবশ্যই ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে।
কখন সার্জারির প্রয়োজন: সাধারণত ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ ঘাড়ব্যথার রোগী অল্প ওষুধ, সঠিক ফিজিওথেরাপি ও বিভিন্ন ব্যায়ামের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে ছয় থেকে আট সপ্তাহ ওষুধ ও ফিজিওথেরাপি নেওয়ার পরও ব্যথা না কমলে, হাতের শক্তি কমে গেলে, অসারতা দেখা দিলে অথবা স্পাইনাল ক্যানেলে গুরুতর চাপ পড়লে সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।
ঘাড়ব্যথা এড়াতে যা করবেন: মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহারের সময় মাথা নিচু না করে সেটি চোখের সমান উচ্চতায় ধরুন। ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের মনিটর চোখের সমান্তরালে রাখুন।
খুব উঁচু বালিশ ব্যবহার না করে নরম ও নিচু বালিশ ব্যবহার করুন। কাত হয়ে ঘুমালে মাথা ও ঘাড়ের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে সারভাইক্যাল বালিশ ব্যবহার করতে পারেন।
মাথায় অতিরিক্ত ভার বহন করবেন না। এক হাতে ভারী জিনিস না তুলে দুই হাতে ভাগ করে তুলুন। দীর্ঘ সময়ের কাজে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো বা লম্বা সফরের সময় ঘাড়ের জন্য ছোট কুশন ব্যবহার করতে পারেন।
লেখক: এমপিটি (নিউরো ফিজিওথেরাপি) পিএইচডি (ব্যাক পেইন), লেকচারার
ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি, রাজশাহী



