নিজের জীবন নিয়েও একদিন পালা হবে ভাবিনি

ইসলাম উদ্দিন পালাকার ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে
পালাগানে অবদানের জন্য ২০২৬ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। ইসলাম উদ্দিন পালাকার একাধারে কিচ্ছাদার, গায়ক আর পরিবেশনশিল্পী। তার কথা শুনেছেন সাইমন জাকারিয়া। ছবি তুলেছেন শরফ উদ্দিন জীবন
আপনার ছেলেবেলা কেমন ছিল?
আমার
জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৬৮।
বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার নোয়াবাদ গ্রামে। বাবা রবিউল্লাহ, মা
আমেনা খাতুন। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ
ছিল না, টেলিভিশনও না।
আনন্দ উপভোগের উৎস ছিল যাত্রা,
কিচ্ছা, জারি আর পালাগান।
আমার দুই বড় ভাই
ঝুমুরযাত্রায় অভিনয় করতেন। আমি গ্রামের মক্তবে
কায়দা, আমপারা পেরিয়ে কোরআন পড়েছি। প্রাথমিকের লেখাপড়া বেশি করিনি। কিন্তু
গ্রামের সেই সাংস্কৃতিক পরিবেশই
আমার
বড় বিদ্যালয়।
গানের জগতে এলেন কীভাবে?
আমার যখন ১২-১৩ বছর বয়স, তখন আমাদের গ্রামে ‘কাশেম-মালা’ ঝুমুরযাত্রা হওয়ার কথা। সব প্রস্তুত, কিন্তু কাশেম চরিত্রের জন্য ছেলে পাওয়া যাচ্ছিল না। সাত-আটজনকে চেষ্টা করিয়েও হারমোনিয়ামের সুরে কারও গলা মেলানো যায়নি। আমি মক্তব থেকে বেরিয়ে মাঝেমধ্যে গানে টান দিতাম। এক চাচাতো ভাই শুনে বললেন, ‘সন্ধ্যায় রিহার্সেলে আসিস।’ ভয় পেয়েছিলাম; বাড়ির লোক জানলে তো মারবে! তবু বাঁশি-ঢোলের টানে গেলাম। লোকের আড়ালে বসেছিলাম। একসময় আমাকে পাঁজাকোলা করে হারমোনিয়াম মাস্টারের সামনে বসিয়ে দিল। লজ্জা আর ভয়ে ঘেমে গেছি। অনেক পীড়াপীড়ির পর গানে টান দিতেই মাস্টার বললেন, ‘তোমার হইছে।’ ওই একটি বাক্য আমার ভেতরের দরজা খুলে দিয়েছিল।
পরিবার বাধা দেয়নি?
বড় ভাই ফাইজুর রহমান যাত্রায় অভিনয় করতেন। তবু প্রথমে রাজি হননি; মক্তবের ছাত্র গান করবে, মানুষ কী বলবে! পরে গ্রামের মানুষের অনুরোধে অনুমতি দিলেন। ‘কাশেম-মালা’র কাশেম হলাম। এরপর ‘দস্যু বাহরাম’সহ আরও কয়েকটি নাটক ও ঝুমুরযাত্রায় অভিনয় করেছি। পুরুষ চরিত্র তো করেছিই, নারী চরিত্রও করেছি। তখন একজন শিল্পীকে গান, সংলাপ, নাচ— সব জানতে হতো। সেখানেই কণ্ঠ, শরীর আর অভিনয়ের প্রথম শিক্ষা লাভ হলো।
পালাগানকেই জীবনের পথ হিসেবে বেছে নিলেন কখন?
একবার গ্রামের লোকজন নিয়ে ‘জীবন্ত কবর’ নাটক দাঁড় করানোর চেষ্টা করি। একজনকে রিহার্সেলে বসিয়ে আরেকজনকে আনতে গেলে ফিরে দেখি, প্রথমজন চলে গেছে। কুপিবাতি জ্বালিয়ে কত কষ্টে মহড়া করেছি, তবু নাটকটি হলো না। অভিমানে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, ‘যেদিন এক হাজার মানুষ ধরে রাখতে পারব, সেদিন আবার গান করব।’ এরপর আমাদের এলাকায় কুদ্দুস বয়াতির কিচ্ছাগানের আসর বসল। তার পরিবেশনা দেখে মনে হলো, এই তো আমার পথ। তাকেই ওস্তাদ মেনে নিলাম।
কুদ্দুস বয়াতির কাছে পৌঁছালেন কীভাবে?
কিশোর বয়সে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে নেত্রকোনায় তার বাড়িতে চলে গেলাম। তিনি বলেছিলেন, আমাকে এক বছরের মধ্যে মঞ্চে তুলবেন। এর পর থেকে বেশ কিছুদিন গুরুর বাড়ির কাজ করেছি, দলের সঙ্গে গ্রামগঞ্জে ঘুরেছি, রাতের পর রাত আসর দেখেছি। ছয় মাস চলে গেল, কিন্তু আমাকে আলাদা করে বসিয়ে কিছু শেখানো হলো না। বাড়িতেও ফিরিনি; পরিবারের লোক জানত না কোথায় আছি।
অভিমানে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, ‘যেদিন এক হাজার মানুষ ধরে রাখতে পারব, সেদিন আবার গান করব’
তাহলে শিখলেন কীভাবে?
ওস্তাদের দলের প্রধান সহকারী বিষ্ণুপদের কাছে দুঃখ বললাম, সময় যাচ্ছে, কিন্তু আমি তো কিচ্ছাপালা শিখতে পারছি না। তিনি তবলচি মাস্টার হাশেমের কাছে যেতে বললেন। হাশেম আমাকে স্নেহ করতেন। তিনি কিচ্ছার কাহিনি বুঝিয়ে দিতেন। বাড়ি থেকে ডায়েরি নিয়ে গেলাম। ওস্তাদ যেখানে যে পালা করতেন, শুনে শুনে তার কাহিনি, গান, বন্দনা, প্রবেশ-প্রস্থান— সব লিখে রাখতাম। তিন মাসের মধ্যে পালাগুলোর কাঠামো আয়ত্ত করে ফেললাম। আমার শিক্ষা শুধু মুখস্থ করা ছিল না; চোখ দিয়ে দেখা, কান দিয়ে শোনা, মনে রাখা এবং নিজের শরীরে বসিয়ে নেওয়াতেও অভ্যস্ত হয়েছি। ৯ মাসের সে সাধনাই আমার জীবনের ভিত।
প্রথম আসরের কথা মনে আছে?
চৈত্র মাসে অনুষ্ঠান কমে গেলে ভাবলাম, এবার নিজের কাজ পরীক্ষা করব। হারমোনিয়াম মাস্টার নিজাম উদ্দিন, তবলচি নিমাই আর একজন ডাইনা শিল্পীকে (পালাগানে যিনি প্রশ্নের বা কথার উত্তর দেন) নিয়ে কেন্দুয়ার কদমশ্রী গ্রামে গেলাম। গ্রামের লোক অহংকার করে বলল, কুদ্দুস বয়াতির গানই তাদের ভালো লাগে না, তার অচেনা ছাত্রের গান শুনবে কেন! মন ভেঙে গেল। তখন ভাবলাম, কী আর করা; সেই চান্নি রাতে কুপিবাতি জ্বালিয়ে নিজেরাই গান করে রাত কাটাব। এমন সময় এক মুরব্বি কিচ্ছা শুনতে চাইলেন।
তারপর?
আমি বন্দনায় টান দিয়ে একটা লাফ দিতেই তিনি বললেন, ‘দাঁড়াও।’ ভাবলাম, শুরুতেই শেষ! কিন্তু তিনি লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেন, তারা কিচ্ছা শুনবে কি না। সবাই রাজি হলে বাড়ি থেকে হ্যাজাক আনালেন, দোকান থেকে তেল ভরালেন। সেই হ্যাজাকের আলোয় আমার প্রথম আসর বসল। পালার নাম ‘গুলে হরমুজ’। ওই রাতের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
প্রথম সফরেই কি সাড়া পেয়েছিলেন?
কদমশ্রী থেকে গছিখাই, ইয়ারাবাজ, নিজগাঁও, খালিয়াজুরী হয়ে আটগ্রাম—টানা ২৪ দিন পালা করেছি। প্রথমদিকে কোনো সম্মানী দাবি করিনি। একজন মাতবর বলেছিলেন, ‘তোমরা কিচ্ছা কইতে থাকো, হিসাব রাখো, টাকা আমি দেব।’ খরচ বাদ দিয়ে দুই হাজার আটশ টাকার কিছু বেশি আয় হয়েছিল। তখন আমার পায়ে জুতা পর্যন্ত ছিল না। খুব কষ্ট করেছিলাম। এখন বুঝি, কষ্ট করেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়।
পালার প্রকৃত ভাব আমি গ্রামেই পাই। গ্রামের মানুষ ভাষা, ইশারা, রসিকতা দ্রুত ধরে ফেলে। শহরে দুই ঘণ্টা পালা করতে যত হিসাব করে কথা বলতে হয়, গ্রামে ছয় ঘণ্টা করেও তত ক্লান্তি আসে না
নিজের দল গড়লেন কবে?
নোয়াবাদে ফিরে তিনজন বাদ্যযন্ত্রীকে নিয়ে দল গড়লাম। তারা স্থানীয় ছেলেদের কিছুদিন প্রশিক্ষণ দিয়ে গেলেন। ১৯৮৯ সালের দিকে নাম হলো ‘ইসলাম উদ্দিন কিচ্ছাকার ও তার দল’; পরে ‘ইসলাম উদ্দিন পালাকার ও তার দল’। শুরুতে ‘উতলা সুন্দরী ও কাকাধরের খেলা’ করতাম। পরে ‘কমলারানীর সাগরদিঘি’, ‘গুলে হরমুজ’, ‘আমির সাধু’, ‘সুন্দরমতি’, ‘অরবুলা সুন্দরী’, ‘রাম-বিরাম’, ‘জাহাঙ্গীর বাদশা’, ‘মতিলাল’, ‘ফিরোজ খাঁ’, ‘রূপকুমার’সহ অনেক পালা করেছি।
সে সময় পালাগানের চাহিদা কেমন ছিল?
নব্বইয়ের দশকে মাসে ৩০-৩৫টি আসরও করেছি। দিনের অনুষ্ঠান শেষ করে রাতে আরেক গ্রামে গিয়েছি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাড়ির বাইরে থেকেছি। বাড়ি ফিরে দেখেছি, নতুন বায়নার লোক অপেক্ষা করছে। হাওরের গ্রামে শীতের রাতে, হালখাতায়, বিয়ের উৎসবে, খোলা মাঠে কিংবা উঠানে— যেখানে ডাকত, দল নিয়ে যেতাম। পালা শুধু গল্প বলা নয়; আমাকে কখনো রাজা, কখনো রানী, কখনো দস্যু, কখনো দরবেশ হতে হয়। ২০-৩০ সেকেন্ডে চরিত্র বদলাতে হয় বলে দ্রুত পাল্টানো যায় এমন পোশাক নিজে নকশা করেছি। একটি পালায় গান, অভিনয়, কাহিনি, হাসি-কান্না— সব একসঙ্গে থাকে। কাল্পনিক কাহিনিকেও এমন সত্য করে তুলতে হয়, যেন দর্শক চোখের সামনে ঘটনাটি ঘটতে দেখে।
গ্রাম ও শহরের দর্শকের মধ্যে কী পার্থক্য দেখেন?
পালার প্রকৃত ভাব আমি গ্রামেই পাই। গ্রামের মানুষ ভাষা, ইশারা, রসিকতা দ্রুত ধরে ফেলে। শহরে দুই ঘণ্টা পালা করতে যত হিসাব করে কথা বলতে হয়, গ্রামে ছয় ঘণ্টা করেও তত ক্লান্তি আসে না। ঢাকায় স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পেলে থাকব কি না— একবার জানতে চাওয়া হয়েছিল। বলেছিলাম, ‘না।’ গ্রামে পালা করেই ঢাকার মানুষের মর্যাদা পেয়েছি; গ্রাম ছাড়লে শিকড় দুর্বল হবে। অনুষ্ঠান না থাকলে আজও নোয়াবাদ আর দরগার ভিটা বাজারের মানুষজনের সঙ্গেই সময় কাটাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হলেন কীভাবে?
১৯৯৭ সালের দিকে বাজিতপুরে আমার পালা দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ জামিল আহমেদ আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যান। গ্রামের মক্তবের ছাত্র হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কিচ্ছাপালার অভিনয় শেখানো— এ আমার জীবনের আশ্চর্য ঘটনা। ‘কমলারানীর সাগরদিঘি’র অভিনয়, কণ্ঠ, শরীরী ভাষা ও পরিবেশনপদ্ধতি হাতে-কলমে শেখাই। আমার প্রশিক্ষণে প্রথম অ্যাকাডেমিক পালার একক অভিনয় করে সাইদুর রহমান লিপন সবাইকে মুগ্ধ করেছে। তার অভিনীত সেই প্রযোজনা পরে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও পরিবেশিত হয়েছে বলে শুনেছি। আমি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা জায়গায় প্রশিক্ষণ দিয়েছি। শিক্ষিত তরুণরা যখন আগ্রহ নিয়ে একটি ভঙ্গি বা সুর শিখতে চায়, তখন মনে আশা জাগে— কিচ্ছাপালা হারাবে না।
দেশের বাইরে পালা নিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকারের ‘বাংলাদেশ উৎসব’-এ দলসহ যুক্তরাজ্যে গিয়েিছ। লন্ডন ও ওয়েলসে পালা করেছি। নিজের গ্রামের ভাষা আর কাহিনি নিয়ে বিদেশের মঞ্চে দাঁড়ানোর অনুভূতি অন্য রকম। ২০০০ সালে আবু সাইয়ীদের ‘কিত্তনখোলা’ চলচ্চিত্রে গান করেছি এবং পর্দায় এসেছি। ২০১৬ সালের ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্টে ‘উতলা সুন্দরী’ করেছি। আমার জীবন নিয়ে আপনি ‘কিচ্ছাদার’ নামে আখ্যান রচনা করেছেন; ২০০৭ সালে নারীগ্রন্থ প্রবর্তনায় নিজের জীবনের সেই পালাও পরিবেশন করি। অন্যের কিচ্ছা বলতে বলতে নিজের জীবন নিয়েও একদিন পালা হবে ভাবিনি।
নিজেও তো পালা লিখেছেন?
করোনার সময় আসর বন্ধ হয়ে গেলে বসে থাকিনি। শেখ রাসেলকে নিয়ে ইতিহাসনির্ভর ‘শেখ রাসেলের করুণ কাহিনি’ লিখেছি। প্রায় ৯ মাস লেগেছে। আমাদের অধিকাংশ পুরনো পালার রচয়িতার নাম জানা যায় না, মুখে মুখে এসেছে। তাই নিজে একটি পূর্ণাঙ্গ পালা রচনার অভিজ্ঞতা আমার কাছে বিশেষ।
‘দেওরা’ আপনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কাজটি কীভাবে দেখেন?
২০২৩ সালে কোক স্টুডিও বাংলার এই গান ভাইরাল হওয়ার পর দেশ-বিদেশ থেকে ফোন এসেছে। যারা কোনোদিন রাতভর আসরে বসেনি, তারাও আমার কণ্ঠ শুনেছে। আনন্দ হয়েছে, দায়িত্বও বেড়েছে। ‘দেওরা’ আমার একার গান নয়; মূল গানটি ফজলু মাঝির। বড় আয়োজনে নানা ধারার সঙ্গে আমার পালাকণ্ঠ যুক্ত হয়েছে। লোকশিল্পে স্রষ্টা ও ধারার পরিচয় ঠিক রাখা জরুরি।
নতুন মাধ্যমের কাজ কেমন লাগছে?
২০২৪ সালে ‘পটু’ চলচ্চিত্রে ‘বিয়ে কেন হলো না’ গানটি গেয়েছি। ২০২৫ সালে নুহাশ হুমায়ূনের ওয়েব সিরিজ ‘২ষ’-এর ‘বেসুরা’ পর্বে প্রথম ওটিটিতে অভিনয় করি। ক্যামেরার সামনে গান করলেও অভিনয়ের প্রস্তাবে প্রথমে চিন্তায় পড়েছিলাম। পরে জানলাম, প্রীতম হাসান আছেন; সাহস পেলাম। গান ও সংলাপ আমার নিজস্ব ভঙ্গিতে ছিল বলে কাজটি আপন হয়েছে। নতুন মাধ্যমে কাজ করলে পালার ভাষা এমন মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়, যারা গ্রামীণ আসরে যেতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মাননা আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
২০২৪ সালে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ আমাকে ‘নাট্যজন সম্মাননা’ দেয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় গ্রামের পালাকার হয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিতে এসেছিলাম, প্রায় তিন দশক পর সেই প্রতিষ্ঠান আমাকে সম্মান জানাল। মনে হয়েছে, আমার শ্রম তারা মনে রেখেছে।
একুশে পদক পাওয়ার খবরটি কীভাবে পেয়েছিলেন?
ঢাকার মহাখালীতে একটি রেকর্ডিংয়ে কণ্ঠ দিচ্ছিলাম। শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রথম ফোন এলো। বিশ্বাস করিনি; ভেবেছি, কেউ মজা করছে। তারপর একের পর এক ফোন। মাথা এমন আউলে গেল যে মোবাইল বন্ধ করে রেকর্ডিং শেষ করলাম। রাতে নোয়াবাদে ফিরে দেখি পরিবার, প্রতিবেশী— সবাই আনন্দে ভাসছে। স্ত্রী জফুরা আক্তার বললেন, ‘আপনে এত নামকরা পুরস্কার পাইছেন, আমরা অনেক খুশি হইছি।’ ছেলে দিদারুল ইসলাম জানাল, আমাকে না পেয়ে কত মানুষ তার কাছে খবর নিয়েছে।
পদক হাতে নেওয়ার মুহূর্তে কী মনে হয়েছিল?
২৬ ফেব্রুয়ারি পদক হাতে নিয়ে মনে হয়েছে, এটি শুধু ইসলাম উদ্দিনের পুরস্কার নয়; পালাগানকে দেশের সর্বোচ্চ মর্যাদার জায়গায় তুলে ধরার স্বীকৃতি। এটি আমার পালাকার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। স্বপ্নেও ভাবিনি, এত বড় রাষ্ট্রীয় সম্মান পাব। আল্লাহর রহমত, মানুষের ভালোবাসা আর এত বছরের সাধনাই আমাকে এখানে এনেছে।
পালাগানের বর্তমান অবস্থা কেমন?
এখন আসর আগের মতো নেই। একসময় মাসে ৩০-৩৫টি অনুষ্ঠান করেছি; পরে মাসে দু-তিনটিও পাওয়া কঠিন হয়েছে। ইউটিউব আর ডিজিটাল বিনোদনের যুগে মানুষ ঘরে বসে সব দেখে; রাতভর আসরের ধৈর্য কমেছে। অনেক শিল্পী জীবিকার জন্য পেশা বদলেছেন, নতুন দল তৈরি হচ্ছে না। যোগ্য উত্তরসূরিও সহজে পাওয়া যায় না। পালা কয়েকটি গান মুখস্থ করার বিদ্যা নয়; এখানে ধৈর্য, সাধনা, কাহিনিবোধ, কণ্ঠ, অভিনয় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা লাগে। এই এলেম যাকে-তাকে দেওয়া যায় না; যে পরিশ্রম করবে, তাকেই দিতে হয়।
এখন আপনার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আমাকে আশাবাদী করে। যেখানে ডাক পাই, শেখাতে ছুটে যাই। সংসার ও দল চালাতে টাকা লাগে, যাতায়াতেও খরচ আছে; কিন্তু টাকার জন্য ইসলাম উদ্দিন পালা করে না। যতদিন বেঁচে আছি, পালা করে যেতে চাই। চাই, আমার জানা পালাগুলো লিখিত ও দৃশ্য-শ্রাব্যভাবে সংরক্ষিত হোক; নতুন শিল্পীরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ পাক, গ্রামে আবার আসর বসুক। শীত বা বর্ষার রাতে গ্রামের উঠানে পাটি বিছানো হবে; শিশু, তরুণ, বয়স্ক সবাই ঘিরে বসবে। হ্যাজাকের আলো না থাকলেও মঞ্চের আলোয় জাহাঙ্গীর বাদশা, মতিলাল, রূপকুমার আর কমলারানী ফিরে আসবে। সেই ভিড়ে আরেকটি ছেলে হয়তো ভাববে, ‘আমিও পালাকার হব।’ তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য আমি নোয়াবাদে ‘ইসলাম উদ্দিন পালাকার একাডেমি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছি। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে পালাকার হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আপনার পরিবার?
আমার স্ত্রী আছেন; আমাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে দিলরুবা এমএ পাস। তার বিয়ে দিয়েছি। এরপর ছেলে দিদারুল ইসলাম মাস্টার্সে পড়ে, গুরুদয়াল সরকারি কলেজে। ছোট মেয়ে দিবা আক্তারও একই কলেজে অনার্সে পড়ে।
অাপনার জীবিকা?
পালাগান করি, গেরস্তি আছে। ছোটখাটো ব্যবসা আছে। একটি স্টুডিও করেছি। ভ্যারাইটিজ জিনিসপত্রও সেখানে বিক্রি করি।
(২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)





