প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর্ট কলেজেই পড়ব

হাশেম খান (জন্ম: ১৬ এপ্রিল ১৯৪২)। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদকজয়ী চিত্রশিল্পী হাশেম খান বিভিন্ন আঙ্গিকে চিত্রকলা নির্মাণে খ্যাতিমান। গ্রাফিক ডিজাইন, বই চিত্র ও নকশা এবং সংবিধানের অলংকরণে নতুনত্ব প্রকাশ করে তিনি দীপ্তি ছড়িয়েছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেওয়ান আতিকুর রহমান ও ওমর শাহেদ।
আপনার ছবি অাঁকার শুরু কি ছোটবেলায়?
হ্যাঁ, েছাটবেলায় ছবি অাঁকতাম আর খুব বই পড়তাম। পড়তে পড়তে ধারণা হয়েছিল, যারা শিল্পী, তাদের প্রধান কাজই হচ্ছে বইতে ছবি আঁকা। তখন গ্রামে থাকতাম; এসব ছবি অঁাকা, প্রদর্শনী করার কোনো ধারণাই ছিল না। ছবি বলতে বইয়ে যা দেখি, তাই। চাঁদপুর শহরে এসে হাসান আলী হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে সেখানে একটি অসাধারণ লাইব্রেরি পেয়েছিলাম। তাতে প্রবাসী, বসুমতী, মডার্ন রিভিউ, রবীন্দ্রনাথের বালক, সন্দেশ, মুকুল— এ ধরনের বহু পত্রপত্রিকার জমজমাট সংগ্রহ ছিল। পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই, ম্যাগাজিন, পত্রপত্রিকা গোগ্রাসে গিলতাম। আমাদের বই পড়ার পাঠকদের একটি দলই হয়ে গিয়েছিল।
লেখালেখির শুরু কীভাবে?
বই পড়ার নেশা থেকেই আমার লেখালেখি শুরু। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। ঢাকা থেকে শিশু-কিশোরদের জন্য উল্লেখযোগ্য মাসিক পত্রিকা ছিল আলাপনি, খেলাঘর; সাপ্তাহিক ছিল মুকুল, সিতারা শাহীন। করাচি থেকে বাংলা ভাষায় প্রকাশ পেত মাসিক পত্রিকা দিগন্ত। এগুলোর পাশাপাশি দৈনিক আজাদের ‘মুকুলের মাহফিল’সহ বিভিন্ন পত্রিকার ছোটদের বিভাগে আমার লেখা ছাপা গল্প, ভ্রমণকাহিনি, কবিতা ও ছড়া ছাপা হতো। সঙ্গে ছবিও এঁকে দিতাম।
আর্ট কলেজে ভর্তি হলেন কোন পরিস্থিতিতে?
১৯৫৬ সালে ম্যািট্রক পাস করি। রেজাল্ট ভালো হলো না। আমার বাবা ইউসুফ খান ও অন্য অভিভাবকরা বললেন, মেডিকেলে ভর্তি করা কঠিন হয়ে যাবে। আমি ভাবলাম, চাঁদপুর কলেজ আছে; সেখানেই ভর্তি হব। বড় ভাই সোলায়মান খান ও ভগ্নিপতি ইউনুস হোসেন আমার ছবি আঁকার কথা জানতেন। ভাই তখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আইএসসি পড়তেন। আমার রেজাল্ট শুনে বাড়ি এসে বাবাকে বললেন, ‘ঢাকায় একটা নতুন কলেজ হয়েছে, আর্ট কলেজ; ওকে সেখানে ভর্তি করে দিন। কুমিল্লায় এসে চিত্রশিল্পীদের নিয়ে বড় একটা এক্সিবিশন করেছেন কামরুল হাসান। আমার খুব ভালো লেগেছে। বুঝেছি, ছবি আঁকার ভবিষ্যৎ আছে।’ আমার বড় চার বোনের মধ্যে চতুর্থজন লতিফা বেগমের স্বামী ইউনুস হোসেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) চাকরি করতেন। সেখানেও ছবি আঁকা একটি বিষয় ছিল। বাবা তার এই জামাতাকে খুব পছন্দ করতেন। ওই ভগ্নিপতিও বাবাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘আর্ট কলেজে পড়লে সে ভালো করবে।’ পরিবারের বাকি সবাই বিরোধিতা করেছিলেন। তখনকার দিনে ধারণা ছিল, শিল্পী মানেই বাউণ্ডুলে। শিল্পীদের তো তখন চাকরিও ছিল না। ফলে বাবা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। মুখ ফুটে কিছু বললেন না। এদিকে আমার ভর্তির সময় চলে যাচ্ছে। আমি চাঁদপুর কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য ফরম তুললাম।
রঙ কিনতে না পারার কারণে আমি প্রথম বর্ষে রঙের কোনো ক্লাস করতে পারিনি। আমরা তো ১৪ জন ভাইবোন। জানতাম, বাবার কাছে রঙতুলির খরচের হিসাব দিলে তিনি বলবেন, ‘তার চেয়ে বরং চাঁদপুর কলেজে ভর্তি হয়ে যা।’ তখন চিত্রশিল্পী হওয়ার একটা মোহের মধ্যে ছিলাম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর্ট কলেজেই পড়ব। শেষ পর্যন্ত আমাকে লড়তেই হবে। অর্থের অভাব যে করেই হোক মেটাতে হবে
তারপর কী হলো?
ঈদুল আজহার আগের দিন। চাঁদপুরের গ্রামের বাড়িতে আমরা সবাই। হঠাৎ ভোরবেলা সাইকেলে চেপে এসে বাবার সামনে তার অফিসের পিয়ন একটা খাম নিয়ে হাজির হলেন। বাবা অবাক হয়ে ইংরেজিতে টাইপ করা চিঠিটি খুলে পড়লেন। বাড়িতে তখন অনেক আত্মীয়স্বজন। আমরা সবাই মিলে নাশতা খাচ্ছিলাম। বাবা আমার দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে কাছে এসে চিঠিটা আমার হাতে দিলেন, ‘এটি তোর চিঠি, পড়ে দেখ।’ পড়ে দেখি, চারুকলার ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদনপত্র। ভর্তি পরীক্ষার তারিখ দেওয়া আছে। সবার মতো আমিও অবাক। আমি তো আবেদন করিনি! পরে জানা গেল, আবেদন ফরম বাবা নিজেই জমা দিয়েছেন। আমাদের তখন প্রচুর পাট হতো। পাট বিক্রির টাকা হাতে দিয়ে বাবা আমাকে ঢাকায় পাঠালেন। পরীক্ষা দিয়ে পাস করে ভর্তি হয়ে গেলাম আর্ট কলেজে।
বইতে আঁকা শুরু হলো কীভাবে?
জগন্নাথ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক সাজেদুল করিম খুব ভালো গল্প লিখতেন। আমার এক ফুফাতো ভাই তার ছাত্র ছিল। ওই ভাইয়ের মাধ্যমেই তার বাসায় গেলাম। আমি চারুকলার ছাত্র— এ কথা জেনে তিনি আমাকে বললেন, ‘আমার প্রথম বই বের হচ্ছে, এই দেখ। এসব গল্প তুমি পড়েছ?’ ‘হ্যাঁ, এটি পড়ছি, ওটিও পড়েছি।’ তিনি বললেন, ‘এগুলোর ছবি আঁকছিল রশীদ চৌধুরী। আর কাভারটি করিয়েছি জনাবুল ইসলামকে (শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ভাই) দিয়ে। রশীদ তো কোনোমতে আমার এগুলো করে দিয়ে স্পেনে স্কলারশিপ নিয়ে চলে গেছে। নতুন দুটি গল্পও এই বইয়ে রাখতে চাই। কাকে দিয়ে যে আঁকাই? তুমি যেহেতু গল্প ভালোবাস, চেষ্টা করে দেখ না!’ তখন ফিগার আঁকাও ভালো করে শিখিনি। তারপরও এক সপ্তাহ দিন-রাত্রি চেষ্টা করে এঁকে ফেললাম। তিনি অনেক চিত্র থেকে পছন্দমতো বেছে নিলেন। সেগুলো ছাপানো হলো।
২১টি বইয়ের পুরো বাংলা সিরিজটির ছবি এঁকেছিলাম। কবি হাবিবুর রহমান আমাকে একসঙ্গে ২১০০ টাকা বিল দিয়েছিলেন। তখন ১ টাকায় ভালো মানের এক কেজি গরুর মাংস পাওয়া যেত
চারুকলায় লেখাপড়া কতটা কষ্টের ছিল?
চারুকলায় পড়ার জন্য যে রঙতুলি ও কাগজ লাগে, সেগুলোর মধ্যে কার্টিজ কাগজ আমরা চন্দ্রঘোনা থেকে পেতাম। আর ভালো কাগজ সবই বাইরের, কলকাতার। রঙ ছিল সব ব্রিটিশ কোম্পানি উইনসর অ্যান্ড নিউটনের। একমাত্র জলরঙই ভালো ছিল। তখন বাজারে আর কোনো রঙ ছিল না। উইনসরের রঙ ছিল ভীষণ দামি। ছোট একটি টিউবের দাম ছয় আনা থেকে দুই টাকা পর্যন্ত। ছয় আনা হলে আমরা তখন একবেলা ভালোমতো খেতে পারি। উইনসর অ্যান্ড নিউটনের জলরঙের ১, ২, ৩ সিরিজের দাম ছিল তিন টাকা। তখন একজন মজুরের সারা দিনের মজুরি ছিল দুই টাকা। একমাত্র সস্তা ছিল পেনসিল এবং পেলিক্যানের কালো কালি। রঙ কিনতে না পারার কারণে আমি প্রথম বর্ষে রঙের কোনো ক্লাস করতে পারিনি। আমরা তো ১৪ জন ভাইবোন। জানতাম, বাবার কাছে রঙতুলির খরচের হিসাব দিলে তিনি বলবেন, ‘তার চেয়ে বরং চাঁদপুর কলেজে ভর্তি হয়ে যা।’ তখন চিত্রশিল্পী হওয়ার একটা মোহের মধ্যে ছিলাম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর্ট কলেজেই পড়ব। শেষ পর্যন্ত আমাকে লড়তেই হবে। অর্থের অভাব যে করেই হোক মেটাতে হবে।
শিক্ষকরা ব্যাপারটি খেয়াল করেছিলেন?
প্রথম বর্ষে রঙের অভাবে টিফিন পিরিয়ডের পর লজ্জা ও দুঃখে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতাম। শেষের দিকে মোহাম্মদ কিবরিয়া স্যার একদিন ডাকলেন, ‘খেয়াল করেছি, তুমি কিন্তু রঙের ক্লাস একটাও করো না। ড্রয়িং করে কোথায় গিয়েছিলে?’ বললাম, ‘স্যার আর এমন হবে না।’ তারপর বন্ধুদের কাছ থেকে রঙ ধার নিয়ে ক্লাস করতে শুরু করলাম। ধরেই নিয়েছিলাম, পরীক্ষাতে ফেল করব। কেননা, রঙের কাজ এত কম করে শুধু স্কেচ এঁকে তো পাস করা যায় না। তখন তো থিওরিও ছিল না। রেজাল্ট বের হওয়া পর দেখলাম, ২১ জন পাস করেছে; আমার নাম ২০ নম্বরে। সেদিন চারুকলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম, আগামী চার বছরে মেধাতালিকায় প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকতেই হবে আমাকে। দ্বিতীয় বর্ষ থেকে ধীরে ধীরে ভালো করতে লাগলাম। চার বছর পর আমরা চারজন প্রথম শ্রেণি পেয়ে পাস করেছিলাম। ‘আমি পারবই’— চারুকলায় পড়াকালে এই আত্মবিশ্বাস সবসময় সঙ্গী ছিল আমার। ফলে যে কাজ অনেকে পারত না, আমি তা পারতাম। আমার থাকার কষ্ট, জিনিসপত্র কেনার কষ্ট— এগুলোকে মোকাবিলা করেছি নিজের বুদ্ধি ও কৌশল দিয়ে।
পূর্ণ উদ্যমে ছবি আঁকতে শুরু করলেন কখন?
‘মুকুলের মাহফিল’-এর পরিচালক এবং দৈনিক সংবাদের শিশু-কিশোর বিভাগ ‘খেলাঘর’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কবি হাবীবুর রহমানের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল। তিনি একদিন আমাকে ডেকে বললেন, “এই দেখ, আমার প্রকাশিতব্য ছড়ার বই ‘আগডুম বাগডুম’। তুমি এর ইলাস্ট্রেশন করে দাও।” আমি তো পুরো বই এর আগে আঁকিনি আগে। পারব কি না— ভাবনায় পড়ে গেলাম। তারপর একসময় ওই বইয়ের ছবি আঁকলাম। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে আরও কাজ দিচ্ছি। শুনেছি, তুমি অনেক কষ্টে আছ। ছবি আঁকার রঙতুিল কিনতে পারছ না। আমাকে আগে বলোনি কেন?’ তিনি তখন আমেরিকান তথ্যকেন্দ্র ইউএসআইএসে চাকরি করতেন। বাংলায় অনুবাদ হতো আমেরিকান বই; সেই বিভাগের প্রধান ছিলেন। কামরুল হাসান, জয়নুল আবেদিনদের সমসাময়িক ও বন্ধু ছিলেন। আমাদের দ্বিতীয় বর্ষে যে এক্সিবিশন হলো, তিনি আমার দুটি ছবি আমেরিকান কালচারাল সেন্টারের সেক্রেটারি জনসনকে নিয়ে গিয়ে কিনে দিয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে একটি স্টিল লাইফ ১২ টাকা ও ওয়াটার কালারের ল্যান্ডস্কেপের জন্য ২০ টাকা দিয়েছিলেন আমাকে। তখনই তিনি বলেছিলেন, ‘আমেরিকান ক্লাসিক উপন্যাস, ক্লাসিক গল্প ও নামকরা লেখকদের বইয়ের বাংলা অনুবাদ নিয়ে আমরা পকেট বুক সিরিজ করব।’ আমার হাতে তুলে দিলেন জর্জ ওয়াশিংটনের ছেলেবেলার পাণ্ডুলিপি। আমি ছবি এঁকে জমা দিলাম তার কাছে। এভাবে ২১টি বইয়ের পুরো বাংলা সিরিজটির ছবি এঁকেছিলাম। তিনি আমাকে একসঙ্গে ২১০০ টাকা বিল দিয়েছিলেন। তখন ১ টাকায় ভালো মানের এক কেজি গরুর মাংস পাওয়া যেত।
এই টাকা দিয়ে কী করলেন?
ফুফাতো ভাই আবদুর রশীদ তখন ন্যাশনাল ব্যাংকে চাকরি করত। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য তার কাছে গেলাম। সে বুদ্ধি দিল, ‘তুই বাড্ডাতে পাঁচ থেকে ছয় কাঠার জমি কিনে ফেল।’ ভেতরে ভেতরে আমি যে জ্বলছি, তা তো সে জানে না। তাকে না জানিয়ে আমি একদিন ব্যাংকে গিয়ে সব টাকা তুলে ফেললাম। সদরঘাটে রঙের দোকান রয়েল স্টেশনারিতে গিয়ে সেই টাকাতে রঙ, ব্রাশ ও কাগজ কিনলাম। এরপর আমার নতুন জীবন শুরু হলো। সাহস এত বেড়ে গেল যে প্রচুর ছবি আঁকতে শুরু করলাম। এরপর পূজার ছুটিতে আমরা পাঁচ বন্ধু সিলেটে গিয়ে চা বাগান, ছাতকসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরলাম। চিত্রশিল্পী গোপেশ মালাকার ওখানকার মানুষ হওয়ায় তার অনেক যোগাযোগ ছিল। সব ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। আমরা পাঁচজন দেড় মাস কাটিয়ে প্রচুর ছবি নিয়ে ঢাকায় ফিরেছিলাম। ফেরার পর শিক্ষকরা আমাদের ছবি দেখে অবাক হয়ে গেলেন। বিশেষ করে আমার আঁকা জলরঙের ছবিগুলো তাদের বেশ মনে ধরেছিল। তখন থেকে সবার কাছে ভালো চিত্রশিল্পী হিসেবে নামডাক বাড়তে থাকল আমার।
বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য অনেকবার পুরস্কার পেয়েছেন। প্রচ্ছদ আঁকতে শুরু করলেন কবে?
‘আগডুম বাগডুম’-এর দুটি খণ্ড একসঙ্গে বেরিয়েছিল ১৯৬২ সালে। প্রকাশ করেছিল চট্টগ্রামের বইঘর প্রকাশনা। প্রকাশক সৈয়দ মোহাম্মদ শফি ছিলেন অত্যন্ত রুচিশীল মানুষ। এই বইয়ের ছবি আমি এঁকেছি ১৯৬০ সালে। তখন আর্ট কলেজে পড়ি। পরের বছর ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি। সে বছর সমগ্র পাকিস্তান মিলে ন্যাশনাল বুক সেন্টার (জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র) বইয়ের প্রচ্ছদ, ইলাস্ট্রেশন ও প্রোডাকশনের ওপর নির্ভর করে সেরা বইয়ের পুরস্কার দিতে শুরু করে। এখনো দেওয়া হয় এই পুরস্কার। তখনকার পুরো পাকিস্তান মিলিয়ে শিশুদের বইতে প্রথম বছর প্রচ্ছদ ও ইলাস্ট্রেশনে সেরা পুরস্কার পেয়েছিলাম আমি। এ পর্যন্ত ১৭ বার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পুরস্কার পেয়েছি।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে আপনার ভূমিকা কী ছিল?
ষাটের দশকে যত আন্দোলন হয়েছে, আওয়ামী লাগের সব পোস্টার আমি করে দিতাম। সেই সময়ে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক নুরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেছিলেন, ‘ছয় দফার পোস্টার, ব্যানার সবকিছুর আর্টওয়ার্ক করার জন্য শিল্পী হাশেম খানের কাছে নিয়ে যাই।’ এভাবে কাজটি আমার কাছে এসেছিল। আমি অনেক ভেবেচিন্তে কাজ শেষ করে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলাম। তখন অনেক রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিক ছয় দফার ছবি, পোস্টার ইত্যাদি দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াও বসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সব দেখে অন্যদের বললেন, ‘আপনারা দেখেন তো এই শিল্পী কী অাঁকলেন? আপনারাই বলেন।’ আমি তখন রীতিমতো ঘামছি। সবাই চুপ। একজন বললেন, ‘এটি তো অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট। ছয় দফার এটি কেমন ছবি?’ আমি তখন বঙ্গবন্ধুকে বললাম, ‘এই ছয় দফা হলো স্বায়ত্তশাসনের। এই ছয় সংখ্যাটি হাজার বছর ধরে বহন করে চলেছে বাংলার মানুষ। বাংলার সবচেয়ে বেশি মানুষ যারা, সেই কৃষকরা এই ছয়কে কেন্দ্র করে চলছেন। ছয় ঋতুর কোন ঋতুতে কী খাবেন, কোন ঋতুতে কী কাপড় পরবেন, কোন ঋতুতে কী চাষ করবেন— সবকিছু এই ঋতুগুলো ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। আপনার রাজনৈতিক বক্তব্যও এই ছয় ঋতুর সঙ্গে প্রতীকীভাবে মিলে যায়। আমি আমাদের ছয় ঋতুর প্রতীকী ছয় রঙ দিয়ে আনুষঙ্গিক নকশা ও লেখার সমন্বয়ে এমন একটি আবহ তৈরি করেছি, যা বাংলার সাত কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের আবহ।’ বঙ্গবন্ধু পাইপ টানতে টানতেই বলে উঠলেন, ‘বাহ্, ছয় দফার ছবিটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’ মানিক মিয়াকে তিনি বললেন, ‘যেদিন ছয় দফা ঘোষণা করা হবে, সেদিন তো ইত্তেফাকে বিশেষ সংখ্যা করবেন। সেদিন ওর আঁকা এই ছয় দফার পুরোটা ছাপিয়ে দেবেন।’ ছয়টি ফর্মে ছয় দফা এঁকেছিলাম। ছয় দফার পোস্টার থেকে শুরু করে ব্যানার— সব নকশা আমার করা। ‘আমাদের বাঁচার দাবী’ স্লোগানটিও আমার লেখা। একজন চিত্রশিল্পীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড় একজন নেতার এমন আস্থা দেখে সেদিন সত্যি অবাক হয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘শিল্পীকে স্বাধীনতা িদতে হবে। তিনি ছয় দফাকে যে প্রতীকী রূপ দিয়েছেন, সেটিই সত্য, সেটিই সুন্দর।’
বাংলাদেশের সংবিধান নকশার কাজ কীভাবে করেছিলেন?
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আমাকে এই কাজ দিয়েছিলেন। আমরা প্রায় তিন মাস সময় নিয়ে কাজটি করেছিলাম। ডিজাইনের জন্য আরও ছিলেন সমরজিৎ রায়চৌধুরী, জনাবুল ইসলাম আর আবুল বারক আলভী। আর হাতের লেখাটি লিখেছেন শিল্পী আবদুর রউফ। তিনি আমাদের কয়েক বছর আগে পাস করেছেন। তার হাতের লেখা ছিল অসাধারণ সুন্দর। সেই দিনগুলো খুব মনে পড়ে।
বাংলাদেশি টাকার নকশার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত ছিলেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের শিল্পকর্ম ও ম্যুরাল কমিটিতে গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, চারুকলার ডিন, জাদুঘরের মহাপরিচালক প্রমুখ থাকেন। এর সদস্য হিসেবে আমি ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের বেশি সময় যুক্ত ছিলাম। আমরা টাকা নকশার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কাজগুলো করতাম। ৫ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০০ টাকা, ২০০ টাকা এবং হাজার টাকার নোটগুলোতে কাজ করেছি। টাকা ডিজাইনের জন্য স্পেশালিস্ট আর্টিস্টরা নকশাগুলো করেছেন।
আপনার প্রতিষ্ঠিত হাশেম খান-পারভীন ট্রাস্টের অধীনে কী কী কাজ হয়েছে?
ট্রাস্ট থেকে অনেক কাজ হয়েছে। দুটি বড় চিত্রমেলার আয়োজন এবং অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছে। তা ছাড়া আমার জন্মগ্রাম চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার সেকদীতে শিশুদের স্কুলে ভর্তির জন্য প্রাথমিক শিক্ষা ও জ্ঞান দেওয়া, মসজিদের ইমামের মাধ্যমে প্রতিদিন সকালে নামাজ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি জানার ব্যবস্থা করেছি। আমার বিদ্যাপীঠ চান্দ্রা ইমান আলি স্কুল ও চাঁদপুর হাসান আলী হাই স্কুলের পাঠাগারে দুটি আলমিরাসহ শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বিনোদনের জন্য নামকরা লেখকদের গল্প-উপন্যাসসহ কয়েকশ বই অনুদান হিসেবে দিয়েছি। নিজের পারিবারিক লাইব্রেরি থেকে এক হাজারের বেশি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও সাময়িকী তিনটি আলমারিসহ দিয়েছি শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে। মিরপুরের একটি প্রাইভেট লাইব্রেরিতে দিয়েছি আট শতাধিক গ্রন্থ, বিশ্বকোষ এবং বিভিন্ন বিষয়ের সংকলন ও সাময়িকী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় একবার নিজের গ্রামে ও চাঁদপুর বস্তিতে ছয় হাজার কম্বল বিতরণ করেছি। গ্রামে কয়েকবার গাছ লাগানোর পাশাপাশি প্রতিনিয়তই নানারকম জনকল্যাণমূলক কাজে সহায়তা করে যাচ্ছি এই ট্রাস্ট েথকে।
এখন আপনার সময় কাটছে কীভাবে?
আমার স্ত্রী পারভীন হাশেম খুব অসুস্থ। তার েদখাশোনা করি। এর
ফাঁকে ছবি আঁকি, লেখালেখি করি, বই পড়ি, পুরনো দিনের গান শুনি। মুভিও দেখি।
(২৩ জুলাই, ২০২৬, উত্তরা, ঢাকা)






