পৃথিবীর আর কোথায় আছে?
নগরের রাজপথে টমটম

মহুবার রহমান
সদরঘাটে জীবনে একবারই একটা টিউশনি করেছিলাম। বেতন পাওয়ার দিন খাম নিয়ে নিত্যদিনের বাস ছেড়ে ঘোড়ার গাড়ি টমটমে উঠে বসি। একজোড়া জোয়ান ঘোড়া খটখট আওয়াজ তুলে জনসন রোড, ইংলিশ রোড পেরিয়ে ছুটে চলে গুলিস্তানের পথে। গুলিস্তান-সদরঘাট সড়কে দীর্ঘ সময় ধরে টমটমের সঙ্গে বাস, ট্রাক, অটো, রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি চলেছে। বর্তমানে টমটমের জন্য এ রুট প্রায় বন্ধ।
পৃথিবীর অন্য কোনো শহরে একই রাস্তায় বিএমডব্লিউ ও ঘোড়ার গাড়ি একসঙ্গে চলে না। নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্ক কিংবা কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে ঘোড়ার গাড়ি বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। ওদের ঘোড়ার গাড়ি সম্পূর্ণ ঢাকা কিংবা রাজকীয় বেশে থাকে। আমাদের টমটম উজ্জ্বল রঙ, বাহারি কাপড় ও লোকাল মোটিফে পরিপূর্ণ থাকে। সব মিলিয়ে ‘ঢাকার টমটম’ একটি প্রায় বিরল ইতিহাসের সাক্ষী। দেড়শ বছর আগে ইউরোপে আধুনিক যোগাযোগের অন্যতম বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। বর্তমানে লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসের সামনে শৌর্যবীর্যের প্রতীক হিসেবে কিংবা প্যারিসে পর্যটকদের বিনোদনের বাহন ঘোড়ার গাড়ি।
১৮৫৬ সালে একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ী ঢাকায় ‘ঠিকা গাড়ি’ নামে ঘোড়ার গাড়ি চালু করেন। শুরুতে এটি নবাব, জমিদার আর ইংরেজদের আভিজাত্যের প্রতীক হলেও দ্রুতই তা পরিণত হয় সাধারণের প্রধান বাহনে। ১৮৯০ সালে ঢাকায় চলত প্রায় ৬০০ টমটম। ২০১০-১২ সালেও গুলিস্তান-সদরঘাট রুটে ৮০-১০০টি টমটম নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করত। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারী এবং পরবর্তীকালে পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সদরঘাটমুখী যাত্রী কমায় টমটমের চাহিদাও কমে যায়।
১৭০ বছরে ক্রমান্বয়ে কমে শুধু বিয়েশাদি, সিনেমার শুটিং বা রাজনৈতিক র্যালির প্রয়োজনে কিছু টমটম এখনো টিকে আছে। টমটম ঢাকার প্রাচীনতম গণপরিবহন, ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ। বাহনটি কি একেবারেই হারিয়ে যাবে?
লেখক: পেশায় প্রকৌশলী এই পর্যটক ঘুরে বেড়িয়েছেন ইউরোপ ও এশিয়া মিলে ১৩টি দেশ




