পৃথিবীর আর কোথায় আছে?
নগরের রাজপথে টমটম

মহুবার রহমান
সদরঘাটে জীবনে একবারই একটা টিউশনি করেছিলাম। ম্যাগি হাতা টি-শার্ট, ছিন্নভিন্ন জিনস প্যান্ট, হাতে হরেক রকমের সুতা-ফিতা-ব্রেসলেট। এই হলো ছাত্রের আউটফিট। যাক বাবা, বেশভূষা না হয় ইগনোর করে গেলাম কিন্তু পড়াশোনা? সে এর আশপাশেও যেতে রাজি নয়। সদরঘাটে গিয়ে ‘ওপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’-এর বাস্তব উদাহরণ পেয়ে যাই। মাস শেষে ৩৮ বাংলাবাজারে হাজিরা দিতে হয়। পুস্তক ব্যবসায়ী পিতার উকিল-জেরা শেষ হলে হাতে পাই বেতনের খাম। পড়াশোনায় ছেলের মন নেই, মাস শেষে বেতন দিতে বাপের গড়িমসি। আরেকটা ভালো টিউশনি পাওয়ার আগপর্যন্ত এটা হজম করে যেতে হয়। বেতনের খাম নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসস্ট্যান্ড চলে আসি। ওইদিন আর বাসে উঠতে ইচ্ছে করে না। ঘোড়ার গাড়ি টমটমে উঠে বসি। একজোড়া জোয়ান ঘোড়া খটখট আওয়াজ তুলে জনসন রোড, ইংলিশ রোড পেরিয়ে ছুটে চলে গুলিস্তানের পথে।
টমটমে কোচোয়ানের পেছনে দুই পাশে মুখোমুখি বসার সিট। টমটম শুধু গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না, অচেনা মানুষদেরও মুখোমুখি বসিয়ে দেয়। কখনো দুজন অপরিচিত মানুষ একদম মুখোমুখি বসে দুলতে দুলতে এগিয়ে যায়। এ যেন ভিন্ন আঙ্গিকে ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে...’র টমটম চিত্রায়ণ। ওপরে ছাদখোলা আকাশ ও পাশে পুরান ঢাকার জরাজীর্ণ কিন্তু ঐতিহাসিক ভবনগুলো দেখতে দেখতে পথচলার অভিজ্ঞতা একদম ফেলনা নয়। বাতাসের ঝাপটায় ঘোড়ার কেশরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে অ্যালজেব্রার কঠিন সূত্র ভুলে যাওয়ার স্মৃতিও কম রোমাঞ্চকর ছিল না।
গুলিস্তান-সদরঘাট সড়কে দীর্ঘ সময় ধরে টমটমের সঙ্গে বাস, ট্রাক, অটো, রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি চলেছে। বিভিন্ন গাড়ির বিরক্তিকর হর্ন, অসহনীয় জ্যামে ঘোড়া দিশাহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটে যায়। একসময় প্রশাসনিক জটিলতা হাজির হয়। বর্তমানে টমটমের জন্য এ রুট প্রায় বন্ধ। পৃথিবীর অন্য কোনো শহরে একই রাস্তায় বিএমডব্লিউ ও ঘোড়ার গাড়ি একসঙ্গে চলে না। নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্ক কিংবা কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে ঘোড়ার গাড়ি বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। ওদের ঘোড়ার গাড়ি সম্পূর্ণ ঢাকা কিংবা রাজকীয় বেশে থাকে। আমাদের টমটম উজ্জ্বল রঙ, বাহারি কাপড় ও লোকাল মোটিফে পরিপূর্ণ থাকে। সব মিলিয়ে ‘ঢাকার টমটম’ একটি প্রায় বিরল ইতিহাসের সাক্ষী। ইউরোপ, এশিয়া মিলে ১৩টি দেশ ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে। আমরা যদি দেড়শ বছর পেছনে যাই, দেখব সেই সময়ের ইউরোপে আধুনিক যোগাযোগের অন্যতম বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। এখন সেটা ইতিহাস। বর্তমানে লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসের সামনে শৌর্যবীর্যের প্রতীক হিসেবে কিংবা প্যারিস শহরে পর্যটকদের বাড়তি বিনোদনের জন্য হাজির হয় ঘোড়ার গাড়ি।
যতদূর জানা যায়, ১৮৫৬ সালে একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ীর হাত ধরে ঢাকার রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন হয়। তখন এর নাম ছিল ‘ঠিকা গাড়ি’। শুরুর দিকে এটি নবাব, জমিদার আর ইংরেজ সাহেবদের আভিজাত্যের প্রতীক হলেও দ্রুতই তা সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান বাহনে পরিণত হয়। ১৮৯০ সালের দিকে ঢাকার রাস্তায় প্রায় ৬০০-এর বেশি টমটম চলত। ২০১০-১২ সালের দিকেও গুলিস্তান-সদরঘাট রুটে প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি টমটম নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করত। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারী এবং পরবর্তীকালে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর সদরঘাটমুখী মানুষের চাপ কমে যায়। একই সঙ্গে টমটমের চাহিদাও মারাত্মকভাবে কমে যায়। ১৭০ বছর পর কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কিছু টমটম এখনো টিকে আছে। বিয়েশাদি, সিনেমার শুটিং বা রাজনৈতিক র্যালির প্রয়োজনে এদের ডাক পড়ে।
টমটম ঢাকার প্রাচীনতম গণপরিবহনের উদাহরণ, ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ। আমাদের অবহেলায় কি একেবারে হারিয়ে যাবে?
লেখক: পেশায় প্রকৌশলী এই পর্যটক ঘুরে বেড়িয়েছেন ইউরোপ ও এশিয়া মিলে ১৩টি দেশ






