ঢাকা শহর ফেলে অন্য কোথাও থাকতে ইচ্ছে করে না

খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির বর্তমান স্বত্বাধিকারী কেএম ফিরোজ খান। অঙ্কন: ফারজিন
জীবনের দীর্ঘ একটা সময় তার কেটেছে নাক টেনে নতুন বই আর কাগজের ঘ্রাণ নিয়ে। লেটার প্রেসের মেশিন চলার শব্দ আজও যেন তার কানে লেগে আছে। ঢাকার বাংলাবাজারের বইপাড়ার অলিগলি, পুরনো শহরের পথঘাট যেমন তাকে চেনে, তেমনি তিনিও চেনেন সেই যাত্রাপথকে নিজের হাতের তালুর মতো। ঢাকা শহরটা তার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠেছে হাতে হাত রেখে। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা খান ব্রাদার্সের কর্ণধার ফিরোজ খান।
‘কেমন লাগল এ শহরের জীবন, বেঁচে থাকা আর মানুষের গল্প?’
প্রশ্নটা শুনে একটু হেসে উত্তর দিলেন, ‘ভালোই তো। ঢাকা শহরে গরুর গাড়িও দেখলাম আবার অত্যাধুনিক গাড়িও দেখলাম। চোখের সামনে ঢাকা রাজধানী হলো। ধানক্ষেত, ফাঁকা জায়গা ভরাট হয়ে আধুনিক শহর তৈরি হলো; সবই তো চোখের সামনে। কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো, কত মানুষ জীবন থেকে বিদায় নিল। এ শহরে কেউ-কাউকে এখন আর চিঠি লেখে না। ল্যান্ডফোনের জায়গা দখল কর নিল মোবাইল ফোন। এলো কম্পিউটার। একটা জীবন কেটে গেল এ শহরের বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। আমার ভালোই লাগল।’
১৯৬৬ সালে মানিকগঞ্জ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় পা রাখা। জগন্নাথ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর জীবন জুড়ে গেল প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে। ১৯৬৪ সালে কলকাতা পুড়ছে দাঙ্গার আগুনে। বাবা বইয়ের ব্যবসা গুটিয়ে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে চলে এলেন। জগন্নাথ কলেজের কাছেই একটি ছোট্ট দোকান হলো তাদের। সেখানেই কলেজের ক্লাসের পর বসতেন ফিরোজ খান। সেই থেকেই শুরু। তারপর ধীরে ধীরে ডালপালা বিস্তার করে খান ব্রাদার্স হয়ে উঠল প্রখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা।
‘যখন বাংলাবাজারে দোকান হলো, কত মানুষ আসত সেখানে’— কথায় কথায় পেছনের পথটার স্মৃতি এসে ভিড় করে ফিরোজ খানের মনে, ‘তখনকার ঢাকার কবি-সাহিত্যিক আর বুদ্ধিজীবীরা আসতেন সেখানে। নিয়মিত আড্ডা জমে উঠত। আসতেন কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রাহাত খান, শওকত ওসমান, কবি আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ। সেই শহরটা, সেই ভালোলাগার সময়টা আজও মনের মধ্যে ভালোবাসার জায়গা হয়ে বসে আছে।’
আজকাল বাংলাবাজারে খুব একটা যেতে পারেন না স্বাস্থ্যগত কারণে। প্রকাশনা জগতের সমসাময়িক বন্ধুদের অনেকেই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। সেই লেখক-বুদ্ধিজীবীদের আড্ডাও আর জমজমাট হয়ে উপচে পড়ে না খান ব্রাদার্সে। সন্তান, ভাইবোন সবাই এ শহর থেকে জীবনের পাট গুটিয়ে চলে গেছেন পৃথিবীর নানা শহরে।
তারও কি এ শহরটাকে ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে? প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় নিলেন না ফিরোজ খান। সোজা জানালেন, ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও কখনো বসবাস করার ইচ্ছা হয়নি তার। পুরান ঢাকার বাসিন্দা ছিলেন ১৯৮১ সাল পর্যন্ত। একটা সময়ে বাড়ি থেকে বের হলে চারপাশে কত চেনা মানুষ, পাড়া-প্রতিবেশী। তারাই তো আত্মার আত্মীয় হয়ে আছে। ঢাকার একদা মিটমিট করে জ্বলা জীবন চোখের সামনে আলো ঝলমল হয়ে উঠেছে— এ শহর ফেলে অন্য কোথাও চলে যেতে মন সায় দেয় না তার।
স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে এবং পরে প্রচুর সিনেমা দেখতেন। সিনেমা দেখতে ভালো লাগত। পুরনো শহরের জমজমাট সিনেমা হলগুলো তার চোখের সামনেই ধীরে ধীরে উঠে গেছে। শেষবার হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছেন কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত ‘আগুনের পরশমণি’। হুমায়ূন আহমেদ টিকিট দিয়েছিলেন। ঢাকা তখন ছিল ছিমছাম এক শহর। এত মানুষের ভিড়ে দমবন্ধ হয়ে ওঠেনি জীবন। তখন বন্ধুদের সঙ্গে কয়েক আনার বাদাম আর আঙুর কিনে চলে যেতেন সদরঘাটে বাঁধা লঞ্চে। সেখানেই জমে উঠত আড্ডা। সেই ঢাকাতেই কেটেছে তার প্রিয় সময়।
তবুও ঢাকাই তার ভালোবাসা। প্রিয় শহর। এই জীবনে প্রবাহ, রোদ, বৃষ্টি, শীত তার ভালো লাগে। এখনো খান ব্রাদার্সের আলো জ্বলে। সন্তানরাও স্থায়ীভাবে অন্য দেশে বসবাস করায় এই বই প্রকাশনার ব্যবসার হাল তারা ধরবে না বলেই মনে করেন ফিরোজ খান। তবুও ঢাকা তাকে বেঁধে রাখল অদ্ভুত এক মায়ায়।




