ঢাকা এক্সপ্রেস
‘এমন হাঁসের মার্কেট দুনিয়ার আর কোনো জায়গায় নাই’

জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে।
বিশাল এই মহাসড়কের মুখে নামতেই একটা শোরগোল— হাঁস খাইলে আসেন, হাঁস খাইলে আসেন।
কোথায় হাঁস? কোথায় হাঁস খাবার দোকান? না, এখানে দূরদূরান্তে হাঁস তো দূরে থাক, ডাল-ভাতের কোনো হোটেলও নেই। এই ডাকাডাকি করছেন অটোচালকরা। হাঁস খেতে হলে এখান থেকে ওনাদের সঙ্গে কয়েক কিলোমিটার পাড়ি দিতে হবে। একেকজন অটোচালক রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করছেন— স্যার, এমন হাঁসের মার্কেট দুনিয়ার আর কোনো জায়গায় নাই। আসেন।
মানে কী! তাহলে কি নানজিং বা বেইজিং চলে এলাম নাকি? এখন কি তাহলে আমরা হাঁসের মাংসের জন্য বিখ্যাত নানজিংয়ের শুশিমেন বা বেইজিংয়ের ফুজিমিয়াও এলাকায় যাব? না, আমরা যাব নীলা মার্কেট; হাঁসের মাংসের শহর।
রাজধানীর পূর্বাচল এলাকায় বালু নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এই বিশাল মার্কেটকে আপনি ছোটখাটো শহর বলে ভুল করলে অন্যায় হবে না। ৩০০ ফুট এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামতেই শত শত লোকের উদ্ভ্রান্ত ছোটাছুটি বলে দিল, আমরা বিশেষ কোথাও চলে এসেছি। গাদা গাদা মোটরসাইকেল, বেশুমার ব্যক্তিগত গাড়ি আর অটোরিকশার দাপটে চোখে অন্ধকার দেখার দশা।
এর মধ্যেই পাশ থেকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই, গরুর হাটটা কোন দিকে?’
আমার অবশ্য এটাকেই গরুর হাট মনে হচ্ছিল; এত ভিড় গরুর হাট ছাড়া আর কোথায় মেলে! তবে আরেক খাদ্য-অভিযাত্রী আঙুল তুলে দেখালেন, রাস্তার বাঁদিকে তোরণ; সেখানে বড় বড় করে লেখা— বিশাল গরু-ছাগলের হাট। একদিকে হাঁসের মার্কেট, আরেকদিকে গরুর হাট; পশু-পাখির কী সহাবস্থান!
পশু-পাখি শান্তিতে সহাবস্থানে থাকলেও মানুষের ধাতে তা নেই। ফলে নদীর পাড় ধরে গড়ে ওঠা কয়েকশ দোকানের এই বাজারের প্রতিটি দোকানে হইচই লেগেই আছে। সেই হইচইয়ের প্রধান ভাষ্য, ‘বসার জায়গা পাচ্ছি না।’
প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা রাস্তার দুই ধারে নানা গড়নের খাবার হোটেল। কোনোটা ধাবা স্টাইলের, কোনো ট্রাক হোটেলের মতো, কোথাও আবার বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট, কোথাও আধুনিক কায়দার দোতলা কাঠের হোটেল। নামের বাহারের শেষ নেই। জামাই, বউ, ভাই, মামা, বাবা এবং মা; পরিবারের সবার নামে এখানে হোটেল আছে— মুসার বাবার হোটেল, শীলার জামাইয়ের হাঁসের রেস্টুরেন্ট কিংবা নাছিরের মায়ের দোকান; এবং এর ফাঁকে নিতান্ত বেমানান জলতরঙ্গ টাইপের নামের দোকান।
নাম যা-ই হোক, সবার মেন্যুর প্রধান আকর্ষণ— হাঁস।
দোতলা এক রেস্টুরেন্টে হাঁসের মাংস আর ছিটা রুটি নিয়ে বসেছে পুরো একটি ৮-৯ সদস্যের পরিবার। পরিবারের মুরব্বি বারবার সবাইকে সতর্ক করছেন, এই গরমে বেশি হাঁসের মাংস খাইও না; অ্যালার্জি হবে। মুরব্বি নিজে নিশ্চয়ই অ্যালার্জির ভয় পান না। কারণ, তার দুই প্লেট ততক্ষণে শেষ। ছিটা রুটির অভাবে তৃতীয় প্লেটে হাত দিতে পারছেন না।
ওয়েটারকে ডাক দিলেন, ‘ভাই শোনো, তোমাগো আরেকটা পোলারে ছিটা রুটি আনতে কইছিলাম। দেখো তো, ও নিচে নাইমা ঈদের ছুটিতে চলে গেছে কি না।’
পরিবারের ছোট বাচ্চাটা ততক্ষণে ঝালে চিৎকার শুরু করেছে। আসলেই ঝাল। দোকানদারই বুদ্ধি দিলেন, এই ঝালের পর মালাই চা আর মিষ্টি পান নাকি সবচেয়ে ভালো ওষুধ। হ্যাঁ, হাঁস নামের রোগ যেমন আছে; তেমনি মালাই চা নামের ওষুধের দোকানও কম না। সেখানে আবার কুষ্টিয়া স্টাইলে পোড়া রুটি আর মালাই চা ফেনোমেনাও বেশ জমজমাট। তবে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করছেন— নাহ, এটা ঠিক মিরপুরের মতো হয়নি। রুটিপোড়া কি আর মিরপুরের মতো হয়!
চায়ের দোকানের সারির পাশেই মেলা। বিশ্বাস করেন, আসলেই মেলা। একেবারে শৈশবে ফিরে যাওয়ার মেলা জমেছে। কাচের চুড়ি থেকে শুরু করে পাটা-পুতো; সে মেলায় কমতি নেই কোনো কিছুর। লোকজনও হাঁস খেতে এসে দিব্যি মেলায় জমে গেছে। বাচ্চারা কান্না জুড়েছে— লাবুবু কিনে দাও। বোঝেন অবস্থা! এই নিখাদ বাংলার মেলায় ঠাঁই নিয়েছে হংকং-চায়নার ট্রেন্ডি পুতুল লাবুবুও।
অবশ্য লাবুবুর দোষ কী। মেলার মাঠের বড়টাই তো দখল করে আছে রোলার কোস্টার ধরনের নানারকম রাইড। পাশেই আবার নাগরদোলা। মানে, গ্রাম-শহর মিলে একাকার। আসলে এই নীলা মার্কেটে দুনিয়াটাই একাকার হয়ে গেছে। এই সবকিছুর পাশে আবার বিখ্যাত মিষ্টির দোকানের সারি। নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি যেমন এখানের বড় আকর্ষণ। মিষ্টি দেখার জন্য দাঁড়াতেই দোকানি চ্যালেঞ্জ করলেন, আপনে একটা খাইতে পারলে আরেকটা ফ্রি। কেজি দুয়েক ওজনের একটা খেয়ে দ্বিতীয়টার জন্য বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা থাকলে অনেকেই নিশ্চয়ই ঝুঁকি নিতেন।
মিষ্টি নিয়ে বেশি ভাবার সময় হলো না। পাশেই তর্ক শুরু হয়ে গেছে। এক তরুণ বারবার ঘাড় ফুলিয়ে বলছে, হাঁসের মাংস খাব না, তোরা খা। বন্ধুদের কথা, হাঁসের মাংস না খাইলে আসছিস কেন? তরুণটি আরও ক্ষেপে গেল— খাব না মানে খাব না।
পাশ থেকে একজন ধমক দিলেন— আসিফ, নীলা মার্কেটে এসে কেউ হাঁসের মাংস না খেয়ে যায় না।
আহ! প্যারালাল ইউনিভার্স। এখানে আসিফ সাহেব নীলা মার্কেটে এসে হাঁস না খাওয়ার জন্য রাগারাগি করেন। এই প্যারালাল দুনিয়ায় থাকাটা ঝুঁকির হয়ে যাচ্ছে।






