অনেক রঙের আলো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৩৪ বছরে পা রাখল সিলেটের এমসি কলেজ। এই উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন। লিখেছেন আহমেদ নূর ও আব্দুল আহাদ। প্রচ্ছদে আছে ক্লাবগুলোর গল্প, যারা সারা বছর মাতিয়ে রাখে ক্যাম্পাসটিকে
এমসি কলেজের কলাভবনের এক কোণ থেকে ভেসে আসছে জোরালো সংলাপ, পায়ের ছন্দময় শব্দ আর আবহ সংগীতের সুর। ভেতরে থিয়েটার মুরারিচাঁদের মহড়াকক্ষে চলছে মঞ্চনাটকের প্রস্তুতি। কেউ চরিত্রে ডুবে যাচ্ছেন, কেউ নির্দেশকের নির্দেশনায় নিজের অভিনয় আরও নিখুঁত করে তুলতে ব্যস্ত। এই মহড়াকক্ষ যেন হয়ে উঠেছে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও সৃজনশীলতার এক জীবন্ত পাঠশালা। ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর তৎকালীন অধ্যক্ষ অধ্যাপক ধীরেশ চন্দ্র সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যাত্রা শুরু করে নাট্য সংগঠন ‘থিয়েটার মুরারিচাঁদ’। সক্রিয় সদস্য ৫০ থেকে ৬০ জন। ২০১৭ সালে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের জন্য থিয়েটার মুরারিচাঁদ ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। ২০১৪ সালে বাকার বকুলের ‘দুর্ঘটনা’ ছিল তাদের প্রথম মঞ্চনাটক। এরপর ‘রংমহল’, ‘পানিবালা’, ‘পুতুল মানুষ’, ‘হরিণচর’ মঞ্চস্থ হয়। এ পর্যন্ত তারা চারটি মঞ্চনাটক, ৯টি পথনাটক, একটি নৃত্যনাট্যসহ বিভিন্ন ধারার মোট ৩৭টি প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেছে।
সভাপতি প্রতীক সিংহ বলেন, ‘আমাদের থিয়েটার কেবল অভিনয় শেখায় না; চিন্তা, নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতাবোধ তৈরি করে। নাটকের মাধ্যমে আমরা সমাজের অসংগতি ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করি।’ সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জানান, নাটকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দলগত কাজ, সময় ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করে।
কলেজের আরেকটি সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মোহনা সাংস্কৃতিক সংঘ’। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত, ৬০ জন সদস্য আছে। জাতীয় দিবস, সাংস্কৃতিক উৎসব, সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক বিকাশে ভূমিকা রাখছে। সভাপতি ইমরান হোসেন উজ্জ্বল বললেন, ‘সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং কলেজে সুস্থ-সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। আমরা নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে ইতিবাচক মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।’
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং কলেজে সুস্থ-সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে
‘মুরারিচাঁদ কবিতা পরিষদ’ ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনে প্রায় ৬০ জন সদস্য রয়েছেন। নিয়মিত সাহিত্য আড্ডা, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি ও আলোচনা সভার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সাহিত্যচর্চার সুযোগ তৈরি করছে সংগঠনটি।
যুক্তির চর্চা করছে ‘এমসি কলেজ ডিবেটিং সোসাইটি’। ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনে প্রায় ১০০ সদস্য আছেন। নিয়মিত সাপ্তাহিক বিতর্ক সেশনের আয়োজন করে। সম্প্রতি নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য বেসিক ডিবেট ওয়ার্কশপ করা হয়েছে। সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ বিলাল উদ্দিন জানান, বিতর্ক শিক্ষার্থীদের শুধু কথা বলতে শেখায় না; বরং যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়।
১৯৭২ সাল থেকে সক্রিয় ‘মুরারিচাঁদ কলেজ রোভার স্কাউট গ্রুপ’ কলেজের অন্যতম বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ১৫০ থেকে ২০০ জন রোভার স্কাউট ও গার্ল-ইন-রোভার এখানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। জাতীয় পর্যায়ে তাদের একাধিক সদস্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘প্রেসিডেন্টস রোভার স্কাউট (পিআরএস) অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক রোভার মুটে সেরা পারফর্মিং ইউনিট হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে দলটি। কলেজের ভর্তি পরীক্ষা, জাতীয় দিবস এবং অভ্যন্তরীণ অনুষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন রোভার স্কাউট সদস্যরা। বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও ক্যাম্পাসে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করেছেন তারা। রোভার স্কাউটের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল খালেক জানান, স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আত্মনির্ভরশীলতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা পায়।
১৯৭২ সাল থেকে সক্রিয় রোভার স্কাউট গ্রুপ কলেজের অন্যতম বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অধীনে পরিচালিত ‘যুব রেড ক্রিসেন্ট (আরসিওয়াই) এমসি কলেজ ইউনিট’-এ প্রায় ১২০ জন নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক সংকটে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য সংগঠনটি প্রশংসা অর্জন করেছে। তারা নিয়মিত ফার্স্ট এইড ও দুর্যোগ মোকাবিলাবিষয়ক প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, রক্তদান কর্মসূচি এবং ডেঙ্গু সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোসাম্মৎ জেবিন আক্তার বলেন, ‘মানব সেবাকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে আমরা শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করি। স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে তারা সমাজের বাস্তব সমস্যাগুলো কাছ থেকে জানার সুযোগ পায়।’
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার জন্য আছে ‘রিপোর্টার্স ইউনিটি’। ২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনে ৩০ জন আছেন। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার মৌলিক বিষয়’ নিয়ে কর্মশালার প্রস্তুতি চলছে তাদের।
কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ও উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এমসি কলেজের বিভিন্ন সংগঠন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।’ কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলেজের বিভিন্ন সংগঠন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। প্রশাসন সবসময় এসব ইতিবাচক কার্যক্রমকে উৎসাহ দিয়ে আসছে।’






