৩৫ এমএমের ছবিবার

(বাঁ দিক থেকে) ক্লাবের আমন্ত্রণে এসে কথা বলছেন অভিনেত্রী নাজিফা তুষি, ক্যাফেটেরিয়ায় উৎসব চলচিত্র উপভোগ করছেন ছাত্র-ছাত্রীরা, অডিটোরিয়ামে সিনেমা প্রদর্শনী শেষে মুভি ক্লাবের সদস্যরা, সেরা ক্লাবের স্বীকৃতি গ্রহণ করছেন ক্লাবের সভাপতি
দুই দশক ধরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ এম এম দ্য কেইউ মুভি ক্লাব আয়োজন করে চলেছে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, তৈরি করছে ছবি, অনুষ্ঠান করছে বিখ্যাত অভিনেতা, নির্মাতাকে নিয়ে। তাদের গল্প শোনাচ্ছেন মিরাজুল ইসলাম
বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। গোলপাতার ক্যাফেটেরিয়ার টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ পড়ে এক ধরনের সুর তৈরি করছে। সন্ধ্যা নেমেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এখানেই বড় পর্দায় চলছে ‘আমার আছে জল’। একশরও বেশি ছাত্রছাত্রী সিনেমাটি দেখছেন। মাঝেমধ্যে কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ ছবি দেখার ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমার দৃশ্য নিয়ে করছেন আলোচনা। সপ্তাহ জুড়ে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর ক্লাস টেস্টের চাপ শেষে এ আয়োজন তাদের কাছে অন্যরকম স্বস্তি। ক্যাম্পাস জুড়ে এ দিনটির নাম ‘ছবিবার’।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র চর্চার এই অনন্য আয়োজনের পেছনে রয়েছে প্রায় দুই দশকের । ২০০৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কয়েকজন চলচ্চিত্রপ্রেমী ছাত্রছাত্রীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘৩৫ এমএম দ্য কে ইউ মুভি ক্লাব’। নামটির উৎস বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহৃত ৩৫ মিলিমিটার ফিল্ম ফরম্যাট থেকেই নেওয়া হয়েছে ক্লাবের নাম।
ক্লাবটির যাত্রার গল্পটাও অনেকটা সিনেমার মতোই। ২০০৬ সালের এক আড্ডায় তখনকার ছাত্র মুত্তাসিফ হাসান দ্বীপ হঠাৎ বন্ধুদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘দোস্ত, আমাদের এখানে কোনো মুভি ক্লাব নেই, চল আমরা একটা মুভি ক্লাব করি।’ প্রথমদিকে খুব বেশি সহযোগিতা না পেলেও পরে নাহিয়ান ও মিঠুসহ কয়েকজন চলচ্চিত্রপ্রেমী ছাত্র এগিয়ে আসেন। হাতে আঁকা পোস্টার তৈরি করে ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে নতুন সদস্য সংগ্রহের আহ্বান জানানো হয়। এভাবেই শুরু হয় মুভি ক্লাবের পথচলা।
সেই সময় বড় পর্দায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা সহজ ছিল না। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও অভাব ছিল। তবু থেমে থাকেননি তারা। ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভালো চলচ্চিত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়মিত প্রদর্শনীর আয়োজন করতে থাকেন।
ক্লাবটির অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন ‘ছবিবার’। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবি থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ দিন টানা ক্লাস ও পরীক্ষা চলে। সপ্তাহের শেষদিন বৃহস্পতিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মুভি দেখানোর আয়োজন। মানসিক চাপ কমানো এবং সুস্থ বিনোদনের সুযোগ করে দিতে এদিন প্রদর্শিত হয় দেশি-বিদেশি নির্বাচিত চলচ্চিত্র।
তবে ৩৫এমএম-এর কাছে চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। ক্লাবটির বর্তমান সদস্যদের ভাষ্য, চলচ্চিত্র হলো মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সমাজের অসংগতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে সবচেয়ে সহজভাবে তুলে ধরা যায় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে তাদের। এ কারণেই ছবিবারে নিয়মিত স্থান পায় বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের গল্প বলা চলচ্চিত্রগুলো। ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘আমার আছে জল’, ‘উৎসব’, ‘মনপুরা’ কিংবা সাম্প্রতিককালের আলোচিত ‘দেলুপি’র মতো চলচ্চিত্রগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। পাশাপাশি প্রদর্শিত হয় আন্তর্জাতিক ক্ল্যাসিক ছবি ও আর্ট ফিল্ম।
ভালো সিনেমা হলের সংকটে থাকা খুলনা শহরের দর্শকদের কাছেও ৩৫ এমএমের আয়োজন আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ‘উৎসব’ এবং ‘দেলুপি’ প্রদর্শনীর সময় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, খুলনা শহরের অসংখ্য মানুষও ক্যাম্পাসে ছুটে আসেন। ক্যাফেটেরিয়ায় জায়গা না পেয়ে অনেককে মেঝেতে বসেও সিনেমা উপভোগ করতে দেখা গেছে। শুধু ‘দেলুপি’ চলচ্চিত্রই প্রায় ৭০০ দর্শক একসঙ্গে উপভোগ করেছেন।
চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে ৩৫ এমএম। এখন পর্যন্ত ক্লাবটি প্রায় ১০টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। এসব চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে সমাজের নানা বাস্তবতা, অবহেলা ও সংকটের চিত্র। ক্লাবটির সর্বশেষ আলোচিত নির্মাণ ‘বাউন্ডুলে ঘুড়ি’। এ ছাড়া ‘বাঁধন’, ‘৩৭ বছর’ এবং ‘ফ্রিডম অব মাইন্ড’-এর মতো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন এ ক্লাবের সদস্যরা। ক্লাবটির আরেকটি বড় শক্তি হলো দেশের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ২০০৯ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ চলচ্চিত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন নির্মাতা নিজে, সঙ্গে ছিলেন অভিনয়শিল্পী তিশা ও মোশাররফ করিম। একই বছর প্রয়াত কিংবদন্তি নির্মাতা তারেক মাসুদ তার ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরবর্তী সময়ে ‘দেবী’, ‘হাওয়া’, চরকির ওয়েব সিরিজ ‘ফেউ’ এবং সর্বশেষ ‘দেলুপি’র কলাকুশলীরাও ক্যাম্পাসে এসেছেন। বিশেষ করে ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন ও তার টিমের উপস্থিতি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। চলচ্চিত্রগুলো দেখার পর নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে বসে সিনেমা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছেন দর্শকরা।
চলচ্চিত্র চর্চার পাশাপাশি প্রকাশনা কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিল ৩৫ এমএম। একসময় তারা ‘চিত্রলিপি’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করত, যেখানে চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ, সমালোচনা ও বিভিন্ন গবেষণামূলক লেখা স্থান পেত। ২০০৯ সালে ‘Friends of 35mm: The KU Movie Club’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ চালু করা হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের পাশাপাশি বিদেশি নির্মাতারাও ছিলেন যুক্ত।
দীর্ঘ পথচলায় এ ক্লাবের অর্জনও কম নয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ক্লাব হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে ৩৫ এমএম। ২০২০ সালে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করে ক্লাবটি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আয়োজন করেছে ‘ফ্রিডম থ্রু ফিল্মস ফেস্টিভ্যাল’। বর্তমানে ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ২১ জন।
অনেক সম্ভাবনার পাশাপাশি এখানে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। রাজধানীর বাইরে অবস্থিত হওয়ায় চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ক্যাম্পাসে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক তরুণ নির্মাতা তাদের সৃজনশীল কাজ এগিয়ে নিতে পারেন না। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহ থাকলেও অনেক সময় তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।




