জীবনযাপন
এক সন্ধ্যায় ডিজিটাল ডিটক্স

মডেল: আয়েশা লিন্ডা; পোশাক: টুয়েলভ; সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
নোটিফিকেশনের বদলে যখন শোনা যাবে ঘড়ির শব্দ, স্ক্রলের বদলে পড়া হবে কয়েক পৃষ্ঠা আর স্ক্রিনের বদলে চোখ উঠবে প্রিয় মানুষের পানে, তখন মন পাবে বিশ্রাম ও প্রশান্তি। লিখেছেন তুলি রহমান
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শহরের কৃত্রিম আলো জ্বলে ওঠে। অথচ কারও কারও চোখ তখনো আটকে থাকে আরেক আলোয়— মোবাইল ফোনের পর্দায়। দিনের কাজ শেষে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে কখন যে একের পর এক বার্তা, ছবি, ভিডিও আর খবরের ভিড়ে হারিয়ে যান, হুঁশ থাকে না! একটি সন্ধ্যা তাই ফিরিয়ে দেওয়া যাক নিজের কাছে। ফোন থেকে একটু দূরে, চারপাশের মানুষ আর নিজের ভাবনার কাছে।
ছোট শুরু
ডিজিটাল ডিটক্স মানে ফোন একেবারে বন্ধ করে রাখা নয়। শুরুতে সন্ধ্যার দুই-তিন ঘণ্টা বেছে নিন। এ সময়টুকু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অপ্রয়োজনীয় বার্তা, ভিডিও কিংবা অবিরাম স্ক্রলিং থেকে দূরে থাকাই লক্ষ্য। জরুরি ফোনের প্রয়োজনে ফোন চালু রেখেই নোটিফিকেশন বন্ধ করা যায়।
আগে জানানো
পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের মধ্যে যারা নিয়মিত যোগাযোগ করেন, তাদের জানিয়ে রাখুন, এ সময়টুকু ফোনে থাকবেন না। বিশেষ করে কাজের প্রয়োজনে ফোন ব্যবহার করতে হলে জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা খোলা রাখুন। এতে ফোন না দেখার সময়টায় কেউ খুঁজছে কি না, এ অস্বস্তি থাকবে না।
ফোনের বদলে হাতে তুলে নিন বই, পত্রিকা কিংবা পুরনো কোনো প্রিয় লেখা
নোটিফিকেশনে মানা
একটি ছোট শব্দও আমাদের মনোযোগ ভেঙে দিতে পারে। তাই ডিটক্সের শুরুতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইমেইল ও অন্যান্য অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। ফোনটি হাতের পাশে না রেখে একটু দূরে রাখুন। কেননা চোখের সামনে না থাকলে বারবার হাতে নেওয়ার প্রবণতা কমে আসবে।
সন্ধ্যায় করণীয়
সন্ধ্যায় ঘরে কোমল আলো জ্বালাতে পারেন। বারান্দায় একটু বসুন কিংবা জানালা খুলে বাইরের বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিন। গাছ থাকলে তাতে পানি দিন, ফুলের যত্ন নিন। দিনের ব্যস্ততার মধ্যে যেসব ছোট কাজ করার সময় হয় না, সেগুলোই হয়ে উঠতে পারে এ সন্ধ্যার সঙ্গী।
বইয়ের কাছে ফেরা
ফোনের বদলে হাতে তুলে নিন বই, পত্রিকা কিংবা পুরনো কোনো প্রিয় লেখা। অনেক দিন ধরে পড়ব বলে রেখে দেওয়া বইটিও এবার খুলতে পারেন। মনোযোগ প্রথম দিনেই দীর্ঘ হবে না। কয়েক পৃষ্ঠা পড়তে পারাও যথেষ্ট। উদ্দেশ্য বই শেষ করা নয়, পর্দার বাইরে মনকে স্থির হতে দেওয়া।
হাঁটার অভ্যাস
সম্ভব হলে কিছুক্ষণ হাঁটুন। পার্ক, ছাদ কিংবা নিরাপদ কোনো পথ বেছে নিতে পারেন। হাঁটার সময় ছবি তোলা বা গান বদলানোর বদলে চারপাশের দিকে তাকান। এর ফলে আকাশের রঙ, গাছের ছায়া, মানুষের চলাচল— এরকম চেনা দৃশ্যগুলোও নতুন মনে হতে পারে।
মুখোমুখি গল্প
একই ঘরে বসেও অনেক সময় দুজনের চোখ থাকে দুই পর্দায়। এ সন্ধ্যায় ফোন সরিয়ে রেখে পরিবারের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। দিনের গল্প, পুরনো স্মৃতি, রান্নার পরিকল্পনা কিংবা আগামী ছুটির কথা— বিষয় বড় হতে হবে না। মন দিয়ে শোনাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
হাতের কাজে মনোযোগ
রান্না, আঁকা, লেখা, সেলাই, ঘর গোছানো কিংবা গাছের যত্ন— যে কাজে আপনার আনন্দ, সেটি বেছে নিন। হাত ব্যস্ত থাকলে মনও ধীরে ধীরে পর্দার অভ্যাস থেকে সরে আসে। চাইলে ডায়েরিতে দিনের অনুভূতি বা আগামী দিনের কাজ লিখে রাখতে পারেন।
খাবারের টেবিলে
সন্ধ্যার খাবারও হতে পারে ডিটক্সের অংশ। খাওয়ার সময় ফোন পাশে না রেখে বরং খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও সঙ্গের মানুষের কথায় মন দিন। একসঙ্গে বসে খাওয়ার পুরনো অভ্যাস ফিরিয়ে আনার জন্য এমন ছোট আয়োজন বেশ কার্যকর হতে পারে।
ঘুমের আগে শেষ পরীক্ষা
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোনে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা হতে পারে। তাই ঘুমের অন্তত কিছুটা আগে ফোনটি চার্জে দিয়ে বিছানা থেকে দূরে রাখুন। অ্যালার্মের প্রয়োজন হলে ঘড়ি ব্যবহার করতে পারেন। ঘুমের আগে স্ক্রল করার বদলে বই পড়া, হালকা গান শোনা কিংবা কিছুক্ষণ নীরব থাকাও হতে পারে উপায়।
ধৈর্য
এক সন্ধ্যার পরই ফোনের অভ্যাস পুরো বদলে যাবে, এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো। বরং সপ্তাহে একটি সন্ধ্যা নির্দিষ্ট করে নিতে পারেন। পরে সময় বাড়ানো যাবে। লক্ষ্য ফোনকে জীবনযাপন থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়; প্রযুক্তির ব্যবহার যেন আমাদের সময়, মনোযোগ আর সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ না করে, সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।



