জাতিসংঘে বাংলাদেশের জয়ে ভারত-পাকিস্তানের ভোট নিয়ে ছড়ানো তথ্যটি কেন ভুয়া?

ছবি: আগামীর সময়
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সাইপ্রাসের কূটনীতিক আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ পদে বিজয় লাভ করেন। বাংলাদেশের এই বড় কূটনৈতিক সাফল্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি বড় ধরনের বিভ্রান্তিকর ও মুখরোচক তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হচ্ছে—এই নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়েছে পাকিস্তান এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছে ভারত। কোথাও কোথাও আবার আরও বেশ কিছু দেশের নাম যুক্ত করে এই কাল্পনিক দাবির বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।
তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত এই দাবিগুলোর কোনো ভিত্তি বা সত্যতা নেই। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন সম্পূর্ণ গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত হয়, ফলে কোন দেশ কাকে ভোট দিয়েছে তা প্রকাশ্যে জানার কোনো সুযোগ নেই।
প্রেক্ষাপট ও ভাইরাল দাবি
গত ২ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও প্রোফাইল থেকে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে মনগড়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির সমীকরণ অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশের বিপক্ষে এবং পাকিস্তান বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ভোট প্রদান করেছে।
অনুসন্ধান ও আসল তথ্য
দাবির সত্যতা যাচাইয়ে জাতিসংঘের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট এবং আন্তর্জাতিক কার্যবিধি পর্যালোচনা করা হয়। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ জুনের ভোটে খলিলুর রহমান ৯৯টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী কাকোরিস পান ৯১টি ভোট। নির্বাচনে মোট ১৯০টি বৈধ ভোট পড়ে এবং কোনো সদস্য রাষ্ট্র ভোটদান থেকে বিরত থাকেনি। তবে জাতিসংঘের এই আনুষ্ঠানিক ফলাফলের কোথাও উল্লেখ নেই কোন দেশ কার পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।
গোপন ব্যালটের আন্তর্জাতিক নিয়ম
জাতিসংঘের কার্যবিধির স্পষ্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী এই দাবিগুলোর কোনো ভিত্তি নেই প্রমাণিত হয়। জাতিসংঘের কার্যবিধির ৯২ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
‘All elections shall be held by secret ballot. There shall be no nominations.’ অর্থাৎ সব নির্বাচনই গোপন ভোটে অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রার্থীদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন প্রক্রিয়া নেই। সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্পূর্ণ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে।
পাকিস্তানের মূলধারার সংবাদমাধ্যম ‘ডন’ (Dawn)-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেও একই বিষয়ের নিশ্চিত হওয়া গেছে। ডন-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভিন্ন কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত না হলে জাতিসংঘের এই ধরনের সব নির্বাচন গোপন ব্যালটেই অনুষ্ঠিত হয় এবং জয়ী হতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনেও পাকিস্তান বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভোট প্রদানের কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ এবং জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলী বিশ্লেষণ শেষে এটি শতভাগ নিশ্চিত যে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন সম্পূর্ণ গোপন ব্যালটে হওয়ায় কোন দেশ কাকে ভোট দিয়েছে তা জানা বা যাচাই করা অসম্ভব। সুতরাং, ফেসবুকে ছড়ানো "বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তান এবং বিপক্ষে ভারত ভোট দিয়েছে" সংক্রান্ত দাবিগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।







