আইয়ুব বাচ্চুর উদ্যোগেই আফরিনের প্রথম অ্যালবাম

আইয়ুব বাচ্চু (১৬ আগস্ট ১৯৬২ – ১৮ অক্টোবর ২০১৮) ও ‘যদি ফিরিয়ে দাও’ অ্যালবামের কাভার
নব্বইয়ের দশকে বাংলা গানে নতুন কণ্ঠ ও সুরের এক প্রজন্ম গড়ে উঠছিল। সেই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন আফরিন হক। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম অ্যালবাম ‘যদি ফিরিয়ে দাও’। এই অ্যালবামের সুর ও সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কিংবদন্তী আইয়ুব বাচ্চু। তবে অ্যালবামটি তৈরিতে তার ভূমিকা শুধু সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গান নির্বাচন, সুর তৈরি, শিল্পীকে গান শেখানো থেকে শুরু করে স্টুডিওতে রেকর্ডিং ও সঙ্গীতে ভারসাম্য আনা; পুরো প্রক্রিয়াতেই ছিল তার নিবিড় সম্পৃক্ততা।
আফরিনের কাছে জানা গেল, কীভাবে আইয়ুব বাচ্চুর উদ্যোগ, ধৈর্য ও আন্তরিকতায় তৈরি হয়েছিল তার প্রথম অ্যালবাম ‘যদি ফিরিয়ে দাও’।
অ্যালবামটি এমন সময় তৈরি হচ্ছিল যখন নতুন কণ্ঠ, নতুন সুর আর ভিন্নধর্মী সংগীতায়োজন নিয়ে চলছিল ক্রমাগত নিরীক্ষা। কুমার বিশ্বজিৎ, এম এ শোয়েব, তপন চৌধুরী, শাকিলা জাফর, সামিনা চৌধুরী, শুভ্রদেব ও কনক চাঁপার মতো শিল্পীরা তো ছিলই। শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেন সাবা তানি, বেবী নাজনীন, সুমনা হক, আলম আরা মিনু, বিপাশা, আফরিন হক ও ইফতেখার সাদীর মতো শিল্পীরাও।
আফরিনের স্মৃতিতে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একজন গানপাগল মানুষ
তাদের কণ্ঠ ও গায়নশৈলী পরিশীলিত করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মকসুদ জামিল মিন্টু, আনিসুর রহমান তনু, সেলিম হায়দার, জালাল আহমেদ, ফোয়াদ নাসের বাবু, মানাম আহমেদ, পান্না দাশ, প্রণব ঘোষের মতো সঙ্গীত পরিচালকরা। পিছিয়ে ছিলেন না আইয়ুব বাচ্চুও।
আইয়ুব বাচ্চুর উদ্যোগেই অ্যালবাম
‘যদি ফিরিয়ে দাও’ অ্যালবামে গান ছিল ১২টি। গান লিখেছেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, লিটন অধিকারী রিন্টু, কল্পনা, হেমায়েত, শাকিল ও অন্যরা। লিখেছেন আইয়ুব বাচ্চুও। রবিন নামে। অ্যালবামটি প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে, অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সারগামের ব্যানারে।
আফরিন হকের ভাষ্য, সংগীতশিল্পী তপন চৌধুরীই প্রথম তাকে আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে আইয়ুব বাচ্চু ঢাকায় চলে আসার পর প্রায়ই তাদের বাসায় যেতেন। আফরিনের মায়ের সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর ছিল স্নেহের সম্পর্ক। আফরিনের মা তাকে খুব পছন্দ করতেন, আর আইয়ুব বাচ্চুও ভালোবাসতেন তাকে। আফরিনের বড় ভাইয়ের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল বেশ ভালো।
আফরিনের প্রথম অ্যালবাম তৈরির পেছনে আইয়ুব বাচ্চুর আগ্রহই ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি অ্যালবামটির প্রায় পুরো দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। সে সময় লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আফরিন তাকে বেশি সময় দিতে পারতেন না। কখনো কখনো বিরক্তও করতেন। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন ধৈর্যশীল। আফরিনের সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েই তিনি অ্যালবামের কাজ এগিয়ে নিয়েছেন।
আফরিনের স্মৃতিতে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একজন গানপাগল মানুষ, একই সঙ্গে ভালো মনের মানুষ।
গান বাছাই ও সুর তৈরি
অ্যালবামটির কাজের ধরন ছিল কিছুটা আলাদা। সারগামের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টিও আইয়ুব বাচ্চুর মাধ্যমেই হয়েছিল। অ্যালবামের জন্য তিনি নিজেই গীতিকারদের দিয়ে গান লিখিয়েছিলেন। সব কটি গানের সুর করেছিলেন।
গান তৈরির সময় আফরিন ও আইয়ুব বাচ্চুর মধ্যে একটি ঘটনা প্রায়ই ঘটত। তার মতে, আইয়ুব বাচ্চু যখন কোনো নতুন সুর শোনাতেন, আফরিন অনেক সময় সরাসরি বলে দিতেন, ‘এটা ভালো হয়নি, আমি এটা গাইব না।’
এতে মোটেই বিরক্ত হতেন না সঙ্গীত পরিচালক। ধৈর্য নিয়ে তার কথা শুনতেন আইয়ুব বাচ্চু। বলতেন, ‘তোর কোনো প্রিয় রাগ-রাগিণী আমাকে শোনা।’
আফরিনের পছন্দের রাগ বা রাগিণী শুনে সেই নোটের মধ্যে থেকেই নতুনভাবে সুর তৈরির চেষ্টা করতেন তিনি। এভাবেই আফরিনের অনুরোধ ও মতামত গুরুত্ব দিয়ে অনেক গানের সুর ও কথা পরিবর্তন করেছিলেন।
ক্যাসেটে গান তুলে দেওয়া
আফরিন বলছিলেন, তাকে গান শেখানোর প্রক্রিয়াটিও ছিল বেশ আন্তরিক। আইয়ুব বাচ্চু অনেক সময় নিজেই মিউজিক ট্র্যাকের সঙ্গে গেয়ে ক্যাসেটে রেকর্ড করে দিতেন। আফরিন সেই ক্যাসেট বারবার শুনে গানগুলো নিজের কণ্ঠে তুলে নিতেন। এরপর মিউজিক ট্র্যাকের সঙ্গে চলত অনুশীলন।
যখন তিনি কোনো গান রেকর্ড করার জন্য প্রস্তুত হতেন, তখন আইয়ুব বাচ্চু সারগাম স্টুডিওতে রেকর্ডিং শিফট বুক করতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রেকর্ডিং হত সন্ধ্যার দিকে। সেখানে মিউজিক ট্র্যাকের সঙ্গে আফরিনের কণ্ঠ নেওয়া হত। এরপর আইয়ুব বাচ্চু রেকর্ডিস্টের সঙ্গে দীর্ঘ সময় নিয়ে গান ও সঙ্গীতের ব্যালান্স ঠিক করতেন।
পুরো প্রক্রিয়াটির দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, এই অ্যালবামটি শুধু একটি সংগীত প্রযোজনার কাজ ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আইয়ুব বাচ্চু'র আন্তরিকতা, ধৈর্য, ভালোবাসা এবং একজন শিল্পীকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার আগ্রহ।
আফরিন হকের প্রথম অ্যালবাম তৈরির ক্ষেত্রে আইয়ুব বাচ্চু নিজের শতভাগ দিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে কত ঘটনা ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু অ্যালবামের পেছনের গল্প শিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালকের সম্পর্ক সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসার এক বিশেষ দলিল হয়ে থাকে। আফরিনের ‘যদি ফিরিয়ে দাও’ তেমনই একটি গল্প।
লেখক : সংগীত সংগ্রাহক





