ছক ভেঙেও তিনি নায়করাজ

রাজ্জাক (জন্ম: ২৩ জানুয়ারি ১৯৪২ মৃত্যু: ২১ আগস্ট ২০১৭) - অলংকরণ: সোহানুর রহমান
ক্যারিয়ারের সুবর্ণজয়ন্তী শেষে ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট জীবনের লেনদেন সমাপ্ত করেন নায়করাজ রাজ্জাক। তাকে নিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি লিখেছেন মাহফুজুর রহমান
১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ রুপালি পর্দায় আসে। তাতে লখিন্দরের চরিত্রকে প্রাণ দেন রাজ্জাক। ‘বেহুলা’রূপী সুচন্দার বিপরীতে নায়ক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। সাফল্য দিয়ে শুরু হয় রাজ্জাকের নায়কজীবন। ২০২৬ সালে এসে তাকে ছাড়াই উদযাপন করতে হচ্ছে সেই ঘটনার ৬০ বছরপূর্তি।
স্বাধীনতার আগে মাত্র পাঁচ বছরে হাফ সেঞ্চুরির মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেন রাজ্জাক। চার-ছক্কা হাঁকিয়ে খুব দ্রুত খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে যান। কাজী জহিরের ‘ময়না মতি’ ও ‘মধুমিলন’, নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘নীল আকাশের নীচে’ ও ‘এতটুকু আশা’, কামাল আহমেদের ‘অধিকার’, আমির হোসেনের ‘যে আগুনে পুড়ি’র মতো সিনেমাগুলো রাজ্জাককে বাণিজ্যের বরপুত্রে পরিণত করে। সুনাম এসে তার পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়ে। গোটা দেশ তার মোহে হয়ে পড়ে আচ্ছন্ন।
স্বাধীনতার পর নিজেকে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন রাজ্জাক। চলচ্চিত্রের চেনা জগৎ ভাঙতে তিনি প্রথম আঘাত করেন নিজেকেই! এতদিনের যত্নে গড়া ভাবমূর্তিকে চূর্ণ করতে উদ্যত হন রাজ্জাক। তার হাতিয়ার তরুণ পরিচালক জহিরুল হক।
’হৈ হৈ রঙ্গিলা রঙ্গিলা রে’— মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর দরাজ কণ্ঠ বসে যায় রাজ্জাকের ঠোঁটে। বর্ষণস্নাত কবরীর কোমর সপাটে জড়িয়ে ধরেন ‘রংবাজ’। মূলত এখান থেকেই বাংলা চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে সাবালক। সামাজিক মুভির চিহ্নিত দুই মুখ সমাজকে নাড়িয়ে দেন। হই হই করে তেড়ে আসে সমালোচক-সম্প্রদায়। রাজ্জাক নির্বিকার; তার হাসিতে মুক্তো ঝরে বক্স অফিসে। জসীমের নয়, যেন বাংলা সিনেমার পুরনো চেহারার মুখে ঘুসি মেরে নতুন দিনের উদ্বোধন ঘটান রাজ্জাক।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’— বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দিন শেষ, এটা রাজ্জাক বুঝে ফেলেন। তিনি তার মধ্যবিত্তে সরলসিধা যুবকের ভাবমূর্তির চোরাগলিতে হারিয়ে যেতে চাননি। পোড়খাওয়া প্রেমিকের একঘেয়ে চরিত্রে আটকে থাকতে চাননি। বিহ্বল ও বিভ্রান্ত সময়ের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে চেয়েছেন নায়করাজ। তাই নিজেকে নিরীক্ষার গভীরে নিক্ষেপ করেন। ১৯৭৩ সালে ‘রংবাজ’ ব্লকবাস্টার হওয়ার পর যেন বিদ্রোহের প্রলয়-নাচন ধরে যায় তার রক্তে।
পরিচালক রাজ্জাকের প্রথম সিনেমা ‘অনন্ত প্রেম’। ১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো বাংলা সিনেমায় আসে চুম্বন। সেন্সর বোর্ড সদস্যদের ঘামিয়ে ছাড়েন রাজ্জাক
১৯৭৩ সালের আরেক সিনেমা ‘অতিথি’। পরিচালকের চেয়ারে আজিজুর রহমান। তরুণ নায়ক আলমগীর ও পয়মন্ত নায়িকা শাবানা এই সিনেমার প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি। রাজ্জাকের তবে এতে কাজটা কী? এখানেই বেজে ওঠে বিপ্লবের ডঙ্কা। সিনেমায় তার কোনো প্রেমিকা নেই। বাংলা সিনেমার এ যাবৎকালের সবচেয়ে পূজিত প্রেমিকপুরুষটি এবার প্রেমিকাহীন। তার সুপার-ডুপারহিট সিনেমা ‘অবুঝ মন’-এর নায়িকা শাবানাকে তিনি ছুড়ে দেন আলমগীরের বুকে। ‘অতিথি’-তে তিনি শুধু একটি চরিত্র হয়ে আবির্ভূত হন। আর সেই চরিত্রকে গোটা দেশের দর্শকসমাজ মাথায় তুলে নাচতে শুরু করে। রাজ্জাক হয়ে ওঠেন বিপ্লবের রণতূর্যবাদক।
১৯৭৪ সালে নিজেকে নিয়ে আরও বড় বাজিতে মেতে ওঠেন নায়করাজ। এবার নিজের কবর রচনা করেন নিজেই! তবে তা শুধু পর্দায়। সেখানে নায়ক মরলে প্রযোজকের মৃত্যু। এই প্রতিষ্ঠিত সত্যের বুকে কষে লাথি দেন রাজ্জাক। ‘বেঈমান’-এর পর্দা নামে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। যেখানে পথে বসার কথা, সেখানে বস্তায় টাকা ভরে বাড়িতে ফেরেন প্রযোজক। আবারও নায়করাজের নিরীক্ষা সফল হয়।
নায়ক মরলেও সিনেমা বেঁচে যেতে পারে। এই সত্য প্রতিষ্ঠা শেষ রাজ্জাকের। নায়ক ও নায়িকা দুজনেই মরে গেলে কেমন হয়? রাজ্জাককে পেয়ে বসে পাগলামিতে। বক্স অফিসের সরু সুতো দিয়ে হেঁটে যাওয়ার রোগ সহজে সারবার নয়; কিন্তু এত বড় ঝুঁকি নেবেন কোন প্রযোজক? নায়করাজ নিজেই নেমে পড়েন পুঁজির থলে হাতে। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো তিনি নিজেই বনে যান নির্মাতা। পরিচালক রাজ্জাকের প্রথম সিনেমা ‘অনন্ত প্রেম’। ১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো বাংলা সিনেমায় আসে চুম্বন।
সেন্সর বোর্ড সদস্যদের ঘামিয়ে ছাড়েন রাজ্জাক। গোটা দেশ উন্মত্ত হয়ে ওঠে ববিতার ঠোঁটে রাজ্জাকের ঠোঁট দেখার জন্য; কিন্তু চরম বেরসিক সেন্সর বোর্ড তার কাঁচির আক্রমণে দর্শকের সুখের বারোটা বাজায়। তবুও ‘অনন্ত প্রেম’ নায়করাজের পরিচালনার জন্য অভিনন্দিত হয়। নায়ক-নায়িকার মৃত্যু সিনেমার জন্য অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ হয়ে আসে। বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় রাজ্জাকের এই নিরীক্ষাও।
১৯৭৮ সালে নায়করাজ আবার নিজেকে সঁপে দেন আজিজুর রহমানের সামনে। এবার তার নায়িকা একখানা জোটে— অঞ্জনা। গানও গেয়ে বেড়ান দুজনে— ‘ঢাকা শহর আইস্যা আমার আশা ফুরাইছে’। কিন্তু ‘অশিক্ষিত’-কে লোকে তাদের অন্তরে জায়গা দিয়েছে ভিন্ন কারণে। রাজ্জাক আর সুমনের অসাধারণ রসায়ন এই সিনেমার প্রাণভোমরা। মুভিতে রহমত চরিত্রে অভিনয় করে নিজের সুপারস্টার ইমেজকে ধুলায় মিশিয়ে দেন নায়করাজ। এই চলচ্চিত্র যা ব্যবসা করেছে, তা অচিন্তনীয়।
রাজ্জাক বারবার বক্স অফিসের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন নতুন নতুন নিরীক্ষা নিয়ে। যেখানে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা, সেখানে দর্শকরা তাকে সাদরে ও সসম্মানে গ্রহণ করেছে। নায়করাজ নিজের শ্রেষ্ঠ সময়ে চেনা ক্রিজে খেলতে ভালোবাসতেন না। অচেনা মাঠে আচমকা আক্রমণে দিশাহারা হতে ভালোবাসতেন। চরিত্র নিয়ে খেলার জাদুকরী ক্ষমতা তাকে পরিণত করেছিল বাজিগরে।






