নাটকের যে সংলাপগুলো আজও ভাইরাল রিলস-মিমে

‘রূপনগর’ নাটকে সহশিল্পীদের সঙ্গে খালেদ খান
সোনালি সময়ে একটাই চ্যানেল ছিল বিটিভি। তখনকার নাটকের সংলাপ সবার মুখে মুখে ফিরত, যেগুলোর আবেদন এখনো কমেনি। লিখেছেন পান্থ আফজাল
‘রূপনগর’ নাটকে খালেদ খানের কণ্ঠে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ‘ছি ছি তুমি এত খারাপ’ সংলাপ। ধারাবাহিক নাটকটির রচয়িতা প্রখ্যাত সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বললেন, ‘সে সময় ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে এক ছিনতাইকারী একজন নারীর চেইন ছিনতাই করতে গিয়ে তাকে খুন করে ফেলেছিল। এই মাস্তানি তখন এত বেড়েছিল, ফলে আমি ওই নাটকে প্রথমে কয়েকজন মাস্তান তৈরি করলাম, তাদের নেতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন খালেদ খান। তাকে দিয়ে আমি বলালাম, মাস্তানরা এত খারাপ, তাদের সারা দেশ ছি ছি করে, এমনকি মাস্তানরাও মাস্তানদের ছি ছি করে। সে কারণেই খালেদের মুখে এই সংলাপ ছিল।’
ইমদাদুল হক মিলনেরই লেখা ‘বারো রকমের মানুষ’-এ বড়ভাই চরিত্রকে একটু পরপর বলতে শোনা যায়, ‘থামলে ভালো লাগে!’ সংলাপটির স্মৃতিচারণা করে এ চরিত্রের অভিনেতা তারিক আনাম খান বললেন, “বিজ্ঞাপন নির্মাতা হিসেবে আমি তখন খুবই ব্যস্ত। ‘বারো রকমের মানুষ’-এ বড়ভাই চরিত্রে অভিনয়ের ডাক পেলাম, যে চরিত্র একটু পরপরই বলবে, ‘থামলে ভালো লাগে’। অভিনয়ের সময় চরিত্রটিকে আমি আরেকটু ঘষামাজা করে নিলাম। ওই সংলাপকে ধরেই বড়ভাই চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলা হলো। এরপর আরেকটু মজা করার পরিকল্পনা করলাম। অদ্ভুত ধরনের একটা হাসি, যে হাসি অন্যদের চেয়ে আলাদা। পরে নাটকটি এতই জনপ্রিয় হয়ে গেল, ‘বাস-ট্রাক আর রিকশার পেছনে ‘হর্ন দিন, থামুন’-এর বদলে লেখা হতো ‘থামলে ভালো লাগে’।”
হুমায়ূন আহমেদের ‘বৃক্ষমানব’ নাটকে অভিনেতা ফারুক আহমেদের কণ্ঠে ‘গাঞ্জা খাইয়া কূল পাই না’ সংলাপটি ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি করে। ফারুক আহমেদ বললেন, “সংলাপটি হুমায়ূন স্যারের লেখা। আমি শুরুতে আপত্তি জানিয়েছি বলেছিলাম, হুমায়ূন ভাই, আমি তো গাঞ্জা খাই না। কেন আমাকে দিয়ে ডায়ালগটি দেওয়াচ্ছেন?’ তিনি বললেন, ‘আরে কিছু হবে না, বলো!’ এখন তো দেখি আমার এ সংলাপের রিলস অনেক জনপ্রিয়।”
বিভিন্ন অভিনেতার কণ্ঠে শোনা নাটকের এমন অনেক সংলাপ এখনো মুখে মুখে ফেরে; এগুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয় প্রচুর মিম ও রিলস।
আমি মিয়ার ব্যাটা, মিয়া: ‘সংশপ্তক’ নাটকে অভিনেতা খলিল উল্লাহ খানের চরিত্র ফেলু মিয়া, যিনি গ্রামের অন্যতম প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য। অনেক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অধিকারী। তার মুখে বিখ্যাত সংলাপ ছিল, ‘আমি মিয়ার ব্যাটা, মিয়া’, ‘টাকা আমার চাই, নইলে জমি’।
বেবাক ফাঁস কইরা দিমু: একই নাটকে হুরমতি চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করে দেশ জুড়ে ‘হুরমতি বু’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন বরেণ্য অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। ‘সংশপ্তক’-এ ফুটে উঠেছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিতা, জেদি, বিদ্রোহিনী, পাল্টা প্রতিশোধপরায়ণ হুরমতির জীবনছবি। তার মুখে যত সংলাপ, সবই ইতিহাস! যেমন— ‘বেবাক ফাঁস কইরা দিমু’, ‘আরে হুরমতি বলছি তো!’
বেশি কথা বলা আমি পছন্দ করি না: হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘বহুব্রীহি’তে খুবই রহস্যময়, অর্ধ প্রকৃতস্থ মামা চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলী যাকের। তাকে পাগল বলে পরিবারের সবাই, অথচ নিজে পাগলের চিকিৎসক হিসেবে কনসালট্যান্সি করছেন। এ নাটকে মামার বলা জনপ্রিয় সংলাপের মধ্যে রয়েছে— ‘কথার মধ্যে কথা বলা আমি একদম পছন্দ করি না’, ‘আপনি প্রতিভা চিনতে পারলেন না’, ‘বেশি কথা বলা আমি পছন্দ করি না’, ‘পাবলিকের মুখ তো আর বন্ধ করা যাবে না’, ‘ফাজিলের দেশ, সব বর্বর’।
আমি কানকাটা রমজান: ‘সংশপ্তক’-এ হুমায়ুন ফরীদি যখন কাঁচা মাটির গন্ধ মেখে এসে ‘কানকাটা রমজান’ হয়ে পর্দা কাঁপালেন, তখন দর্শক কান দিয়ে শুনলেন, মন দিয়ে ভালোবেসে ফেললেন! তার অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি, গলা উঁচিয়ে সংলাপ বলা আর সেই ভয়ংকর কিন্তু মায়াভরা হাসি আজও দর্শককে নস্টালজিয়ায় ডুবিয়ে রাখে। কানকাটা, কিন্তু জনপ্রিয়তায় কান ফাটানো! ‘আমি কানকাটা রমজান!’— শুধু একটি সংলাপেই চমকে উঠেছিল দেশ। তা ছাড়া ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’ নাটকে ফরীদির ‘আমি তো জমি কিনি না, ফানি কিনি’ সংলাপটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
বিলিক ইন হুয়াইট: ‘বহুব্রীহি’তে রহিমার মা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মাহমুদা খাতুন। তার মুখে কিছু সংলাপও জনপিয় হয়েছিল। যেমন— ‘আমারে একটা ছবি তুলে দিবেন? বিলিক ইন হুয়াইট!’, ‘মানুষের স্বাদ-আহ্লাদ বলে কি কিছু নাই?’
সে এক বিরাট ইতিহাস: হুমায়ূন আহমেদের ‘নিমফুল’ নাটকের আমিরুল হক চৌধুরীর সেই বিখ্যাত সংলাপ, যা এখনো জনপ্রিয়। সংলাপটি হলো, ‘সে এক বিরাট ইতিহাস’।
মাইরের মধ্যে ভাইটামিন আছে: হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ঐতিহাসিক চরিত্র বাকের ভাইয়ের মুখের প্রায় সব সংলাপই দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন আসাদুজ্জামান নূর। সে সময় তার মুখে সংলাপ ছিল— ‘মাইরের মধ্যে ভাইটামিন আছে!’, ‘কথা বলবে না, কথা কম কাজ বেশি’, ‘গোঁফ অফ কইরা দে’।
বকবক করিস না, গলা টিপে ধরুম: ‘কোথাও কেউ নেই’তে আবদুল কাদের অভিনীত বদি চরিত্রের ভাইরাল সংলাপগুলো বাংলাদেশের টিভি নাটকের ইতিহাসে একেকটি ক্লাসিক লাইন! যেমন— ‘বাকের ভাই অনেক বড় পোলা; কিন্তু আমি কোনো ছোট পোলা না!’, ‘আমি যা বলি তাই করি, আর যা করি সেটা বলে করি না।’, ‘আমি বদি, কারও বাপরে ভয় পাই না!’, ‘চেহারার দিকে না তাকিয়ে কাজের দিকে তাকান!’, ‘আমি ল্যাংড়া হইতে পারি, কিন্তু বেকুব না।’, ‘বকবক করিস না, গলা টিপে ধরুম।’
আমি সৈয়দ বংশের ছেলে: ‘বহুব্রীহি’তে কাজের ছেলে কাদের চরিত্রে আফজাল শরীফ এমন দারুণ অভিনয় করেছেন, তার নামই হয়ে উঠেছিল ‘কাদের’। এ নাটকেই তার সেই বিখ্যাত সংলাপ, ‘আমি সৈয়দ বংশের ছেলে’। তা ছাড়া, ‘চশমাটা বড়ই সৌন্দর্য’, ‘টেকা পয়সাই কি জীবনের সব?’, ‘আমি চোর না, স্যার!’ সংলাপগুলো আজও অমলিন।
হিজিবিজি হিজিবিজি: হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত নাটক ‘আজ রবিবার’-এ আনিস চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জাহিদ হাসান। এখানে তার জনপ্রিয় সংলাপের মধ্যে রয়েছে, ‘আশ্চর্য! মেয়েটা রেগে গেল কেন?’, ‘তিতলী ভাইয়া, কংকা ভাইয়া’, ‘কংকা ভাইয়া, আমাকে এক গ্লাস পানি এনে দাও তো, নরমাল’, ‘হিজিবিজি, হিজিবিজি এবং হিজিবিজি’।







