আগামীর সময়

‘দম’: নিশোর নিঃশব্দ উত্থান

‘দম’: নিশোর নিঃশব্দ উত্থান

সংগৃহীত ছবি

রেদওয়ান রনির ‘দম’ কেবল একটি সারভাইভাল থ্রিলার নয়; এটি বাংলা চলচ্চিত্রের মানচিত্রে এক দীর্ঘশ্বাস। কারণ, দম বৈশ্বিক সিনেমার ব্যাকরণ মেনে চললেও তার শেকড় কিন্তু বাংলার মাটিতে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সিনেমা যখন বিশ্বমানের কারিগরি ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা খোঁজার চেষ্টা করছে, তখন ‘দম’ সেই চেষ্টাকে এক সার্থক রূপ দিয়েছে।

এই ছবির মূল স্তম্ভ আফরান নিশো। নূর চরিত্রে তিনি নিজেকে ভেঙে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন যেখানে তার শরীরী ভাষাই সংলাপের চেয়ে বেশি কথা বলে।

হলিউড অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস (Cast Away) বা লিয়াম নিসন (The Grey) এর সারভাইভাল মোডের সাথে নিশোর এই পারফরম্যান্সের তুলনা টানা যেতে পারে। বন্দিদশার পরবর্তী ধাপে নিশোর অভিনয় ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত বা ‘ইনওয়ার্ড’।

যদিও বাণিজ্যিক সিনেমার কিছু চিরাচরিত প্রথা মেনে ‘বাঙালি মুসলমান’ পরিচয় জাহির করার মতো বাড়তি সংলাপ যোগ করা হয়েছে, যা কিছুটা শ্রুতিকটু লেগেছে; তবে সামগ্রিকভাবে নিশো তার নিস্পৃহ চাহনি আর প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার আকুতি দিয়ে সেই খামতি পুষিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে গাধার পিঠে চড়ে সেই অনিশ্চিত যাত্রার দৃশ্যগুলো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আইকনিক হয়ে থাকবে।

রেদওয়ান রনি এখানে শুধু গল্প বলেননি, তিনি একটি ‘সাইকোলজিক্যাল জিওগ্রাফি’ নির্মাণ করেছেন।

পাবনার স্নিগ্ধ শ্যামলিমার বিপরীতে আফগানিস্তানের বা তাজিকিস্তানের রুক্ষ, ধূসর ও জনশূন্য মরুপ্রান্তর। এই দুই ভুবনের কনট্রাস্ট দর্শকের মনে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে।

ছবির লং শটগুলো অসাধারণ। মরুভূমির বিশালতার মাঝে নিশোকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করে দেখানো হয়েছে, যা মানুষের অস্তিত্বের অকিঞ্চিৎকর অবস্থাকে ফুটিয়ে তোলে। এখানে চিত্রগ্রাহক প্রতিটি ফ্রেমে যেন নিঃসঙ্গতার এক একটা অধ্যায় এঁকেছেন।

ছবিটি দেখতে গিয়ে ইনারিতুর ‘Babel (২০০৬)’ বা ড্যানি বয়েলের ‘127 Hours’-এর মতো চলচ্চিত্রের রেশ পাওয়া যায়। বিশেষ করে সংলাপে জোর না দিয়ে পরিস্থিতির মাধ্যমে দমবন্ধ করা টেনশন তৈরি করার যে পদ্ধতি-তা হলিউড ঘরানার আধুনিক ডিরেকশন স্টাইলকেই মনে করিয়ে দেয়। তবে ‘দম’ কোনোভাবেই অনুকরণ নয়; বরং সত্য ঘটনা অবলম্বনে এটি একটি খাঁটি বাংলাদেশি এবং মৌলিক প্রয়াস, যা নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজনের হাই-বাজেট প্রোডাকশনের সাথে পাল্লা দেওয়ার সামর্থ্য রাখে বলে মনে করছেন দম সংশ্লিষ্টরা।

সুজিত চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় কিছু কিছু জায়গায় আরোপিত লেগেছে। ইমোশনাল জায়গায় তিনি একটু অপ্রস্তুত ছিলেন বলে মনে হয়েছে। তবুও তিনি বরাবরের মতোই অসাধারণ। তিনি ছবির সেই ‘গ্রে-শেড’ যা দর্শককে দ্বিধায় রাখে। তার উপস্থিতিই গল্পের অনিশ্চয়তা আর টেনশনকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।


জোহরা পারভীন রানী হিসেবে পূজা চেরি যেন সেই বিজ্ঞাপনের পরিচিত কিশোরী থেকে পূর্ণাঙ্গ অভিনেত্রীতে রূপান্তর হলেন। তার ঢাকা শহরে স্বামীর মুক্তির জন্য সেই মরণপণ লড়াই ছবিটিকে একটি গভীর মানবিক ভিত্তি দিয়েছে।


ছবির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে বিদেশি অভিনেতাদের সাবলীল অভিনয় এবং রনির নিপুণ ডিরেকশন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

ছবিটি তিনটি স্তরে আমাদের ভাবিয়ে তোলে। সেগুলো হচ্ছে-
পুঁজিবাদী রাজনীতি: এনজিওর ঋণের জালে পিষ্ট হওয়ার পর মানুষের নৈতিক ভাঙন।
ভূ-রাজনীতি: যেখানে একজন মানুষের জীবন রাষ্ট্রীয় শক্তির কাছে নিছক একটি ‘পণ্য’ বা দরকষাকষির মাধ্যম।
মানবিকতা: জীবনপণ লড়াইয়ের পর প্রতিপক্ষকে সৎকার করার যে দৃশ্য, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-শ্বাস নেওয়া আর বেঁচে থাকা এক জিনিস নয়।

তবে প্লাস পয়েন্ট দমর সাউন্ড ডিজাইন, আফরান নিশোর মেথড অ্যাক্টিং, মরুময় লোকেশন ও মেটাফোরিক্যাল স্টোরিটেলিং।


আর মাইনাস পয়েন্ট এডিটিংয়ে সামান্য দ্রুততা এবং চিত্রনাট্যের কিছু জায়গায় অতি-বাণিজ্যিক হওয়ার প্রবণতা।

‘দম’ একটি ল্যান্ডমার্ক সিনেমা। রেদওয়ান রনি প্রমাণ করেছেন, আমাদের চলচ্চিত্রের হাজারও সীমাবদ্ধতা থাকলেও যদি ‘দম’ বা সাহস থাকে, তবে বিশ্বমানের সিনেমা নির্মাণ সম্ভব। এটি কেবল একজন মানুষের বেঁচে থাকার গল্প নয়, এটি একটি জাতির চলচ্চিত্রের সাবালক হওয়ার দলিল।

দম রেটিং : ৭/১০

    শেয়ার করুন: