আগামীর সময়

অস্কার হয়ে উঠলো রমরমা জুয়ার বাজার

অস্কার হয়ে উঠলো রমরমা জুয়ার বাজার

অস্কার নিয়ে জুয়া। ছবি: হলিউড রিপোর্টার

খেলাধুলায় জুয়ার কীর্তি নতুন কিছু নয়। সেই জুয়ার বাজার ছুঁয়ে দিল অস্কারের হলরুমেও। বিনোদন জগতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অনুষ্ঠান অস্কারকে ঘিরে প্রতি বছরই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও আগ্রহ দেখা যায়। তবে ২০২৬ সালের অস্কার হয়ে উঠেছে প্রেডিকশন মার্কেট বা ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বিনিয়োগের খনি।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মানুষ এখন অস্কারের সম্ভাব্য বিজয়ীদের নিয়ে অর্থ বিনিয়োগ করছে, আর সেই বাজারে কোটি কোটি ডলারের লেনদেন হচ্ছে। ফলে অস্কার শুধু বিনোদন অনুষ্ঠানই নয়, একই সঙ্গে এটি এখন একটি বড় অর্থনৈতিক বাজারেও পরিণত হয়েছে।

এবারের অস্কারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার নিয়ে নাটকীয়তা ঘটেছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে। কয়েক সপ্তাহ আগেও সেরা অভিনেতা বিভাগে জয়ের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ফেভারিট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন অভিনেতা টিমোথি শ্যালামে। প্রেডিকশন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম কালশিতে তার জয়ের সম্ভাবনা এতটাই বেশি ছিল যে, বাজারে তার চুক্তির দাম দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬৮ সেন্টে। অর্থাৎ বাজারের বড় অংশের বিনিয়োগকারীই মনে করছিলেন, অস্কার জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তারই।

কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিনেতা মাইকেল বি. জর্ডান যখন স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডসে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতে নেন, তখনই অস্কার দৌড়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। সেই ঘটনার পরপরই কালশির বাজারে শ্যালামের সম্ভাবনার দাম দ্রুত নেমে আসে এবং তার চুক্তির মূল্য কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫১ সেন্টে। অর্থাৎ বাজারে তার জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে শুরু করে।

এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ৬ মার্চ। ওই দিন টিমোথি শ্যালামে একটি মন্তব্য করেন, যা অনেকের কাছে ব্যালে ও অপেরা শিল্পকে অবমূল্যায়ন করার মতো মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এবং দ্রুত তা বিতর্কে রূপ নেয়। যদিও এই মন্তব্যের সরাসরি কোনো প্রভাব অস্কারের ভোটে পড়ার সুযোগ ছিল না, কারণ অস্কারের ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে গিয়েছিল ৫ মার্চই। তবুও বাজারের মনোভাব বদলে যাওয়ার কারণে প্রেডিকশন মার্কেটেও পরিবর্তন দেখা যায়।

৭ মার্চের পর থেকে বাজারে সেরা অভিনেতার দৌড়ে এগিয়ে যেতে শুরু করেন মাইকেল বি. জর্ডান।
এই পরিস্থিতি দেখায় যে, প্রেডিকশন মার্কেট অনেক সময় বাস্তব ফলাফলের চেয়ে মানুষের ধারণা ও মনোভাবের ওপর বেশি নির্ভর করে।

ভোট শেষ হয়ে গেলেও যদি জনমত বা আলোচনার ধারা বদলে যায়, বাজারও সেই অনুযায়ী ঢলে পরে।
২০২৬ সালের অস্কারকে ঘিরে এই বাজার কত বড় হয়ে উঠেছে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায় লেনদেনের পরিমাণ থেকে। ১০ মার্চ পর্যন্ত শুধু কালশি প্ল্যাটফর্মেই অস্কারসংক্রান্ত চুক্তিতে প্রায় ৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার লেনদেন হয়েছে। তুলনায় ২০২৫ সালে পুরো অস্কার মৌসুমে এই প্ল্যাটফর্মে মোট লেনদেন হয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। অস্কার অনুষ্ঠান যত এগিয়ে আসছে, ততই এই লেনদেন আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কালশির মুখপাত্র জ্যাক সাচ জানিয়েছেন, অস্কার তাদের জন্য অন্যতম দ্রুত সম্প্রসারিত বাজারে পরিণত হয়েছে। তার মতে, এটি এমন একটি বড় ইভেন্ট যেখানে বিপুল পরিমাণ লেনদেন হয় এবং ব্যবহারকারীদের আগ্রহও ক্রমেই বাড়ছে।

এই বাজারে কালশির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে পলিমার্কেট। এই প্ল্যাটফর্মেও অস্কারকে ঘিরে ব্যাপক লেনদেন হচ্ছে। শুধু সেরা চলচ্চিত্র বিভাগেই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ডলার লেনদেন হয়েছে। তুলনায় ২০২৫ সালে পুরো সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে মোট লেনদেন ছিল মাত্র ৫৩ লাখ ডলার। বর্তমানে দুই প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে অস্কারসংক্রান্ত চুক্তিতে মোট লেনদেন ১০ কোটিরও বেশি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সেরা চলচ্চিত্রের দৌড়েও একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ নামের চলচ্চিত্রটি এই বিভাগে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং প্রেডিকশন মার্কেটে এর সম্ভাবনা প্রায় ৭৫ সেন্ট ধরা হচ্ছে।

প্রেডিকশন মার্কেট নতুন কোনো ধারণা নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্তের পর এই বাজারে বড় পরিবর্তন আসে। একটি ফেডারেল আপিল আদালত কালশিকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে চুক্তি দেওয়ার অনুমতি দেয়। সেই নির্বাচনে অনেক জরিপ সংস্থা ফলাফলকে সমান সম্ভাবনার লড়াই হিসেবে দেখলেও কালশির ব্যবহারকারীরা ব্যাপকভাবে বাজি ধরেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের ওপর। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প জিতলে এই প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক প্রমাণিত হয় এবং এরপর থেকেই প্রেডিকশন মার্কেটের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।

এই প্রবণতা দেখে বড় বড় স্পোর্টস বেটিং কোম্পানিও আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ড্রাফটকিংস এবং ফ্যানডুয়েল। ড্রাফটকিংস ২০১৯ সাল থেকেই অস্কার নিয়ে বাজির সুযোগ দিচ্ছে। প্রথমদিকে এটি কেবল নিউ জার্সিতে অনুমোদিত ছিল, তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে অস্কার বেটিং অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমানে মিশিগান, ইন্ডিয়ানা, অ্যারিজোনা, ম্যাসাচুসেটস, লুইজিয়ানা, ক্যানসাস, মিসৌরি এবং পুয়ের্তো রিকোতেও অস্কার নিয়ে বাজি ধরা বৈধ।

তবে প্রেডিকশন মার্কেটকে সাধারণ জুয়ার মতো দেখা হয় না। এগুলোকে ফিউচার্স কনট্র্যাক্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এর তদারকি করে যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি ফিউচার্স ট্রেডিং কমিশন।

বাজার যত বড় হচ্ছে, ততই নতুন ধরনের উদ্বেগও সামনে আসছে। বিশেষ করে ইনসাইডার ট্রেডিং বা ভেতরের তথ্য ব্যবহার করে লাভ করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ অস্কারের বিজয়ীদের নাম অত্যন্ত গোপন রাখা হয়। সাধারণত হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্সের মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা আগেই ফলাফল জানেন।

তবু যদি কেউ আগে থেকে তথ্য পেয়ে বাজারে বিনিয়োগ করে, তাহলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কালশি জানিয়েছে, তারা শেয়ারবাজারের মতোই উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে। কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন ধরা পড়লে তারা তদন্তও করে।

এছাড়া অস্কার আয়োজক সংস্থা একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের সদস্যদের এই বাজারে অংশ নেওয়া কালশি সরাসরি নিষিদ্ধ করেছে। যদিও একাডেমির নিজস্ব নিয়মে এ বিষয়ে আলাদা কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে ভোটিং প্রক্রিয়ায় পেশাদারিত্ব ও সততা বজায় রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

সূত্র: হলিউড রিপোর্টার

    শেয়ার করুন: