কান মাতাচ্ছেন ‘সুপার গ্ল্যামারাস’ বয়স্ক অভিনেত্রীরা

ক্যাথরিন দেন্যুভ (ডান দিক থেকে চতুর্থ) এবং চলচ্চিত্র ‘ইস্তোয়ার পারালেল’-এর অন্যান্য অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীরা রেড কার্পেটে উপস্থিত ছিলেন।
জমকালো ফ্যাশন আর রূপের ঝলকানি নিয়ে কানের রেড কার্পেট সবসময়ই থাকে আলোচনার শীর্ষে। তবে ২০২৬ সালের এই কান উৎসবে লেগেছে এক নতুন হাওয়া। তরুণীদের টেক্কা দিয়ে ফ্যাশনের দুনিয়ায় এবার খবরের শিরোনাম হচ্ছেন সত্তরোর্ধ্ব একদল প্রবীণ নারী।
৯২ বছর বয়সী এভারগ্রিন তারকা জোয়ান কলিন্স এ সপ্তাহে কানের লাল গালিচায় হেঁটেছেন ধবধবে সাদা রঙের এক গাউন পরে। ৮৮ বছর বয়সী জেন ফন্ডা নিজের ফ্যাশনের জাদু দেখিয়েছেন গুচি ব্র্যান্ডের ঝলমলে এক লম্বা ড্রেস পরে।
এছাড়া ৭৩ বছর বয়সী ইসাবেলা রোসেলিনি এবং ৮২ বছরের ক্যাথরিন ডেনেভ কানের মঞ্চে হাজির হয়েছেন নিজেদের মার্জিত ও রাজকীয় সব পোশাকে।
এই গুণী অভিনেত্রীরা মূলত এসেছেন উৎসবে নিজেদের নতুন নতুন প্রজেক্ট আর সিনেমার প্রচারণা করতে। জোয়ান কলিন্স ও ইসাবেলা রোসেলিনি দুজনেই অভিনয় করছেন ‘মাই ডাচেস’ নামের এক সিনেমাতে। রেড কার্পেটে তাদের এই দুর্দান্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ফ্যাশন আসলে কোনো নির্দিষ্ট বয়সের ফ্রেমে বন্দী থাকে না।
ফ্যাশন দুনিয়ার বোদ্ধারাও বুড়ো বয়সের এই দারুণ গ্ল্যামার দেখে অবাক হয়ে গেছেন। ‘দ্যাট’স নট মাই এজ’ ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালিসন ওয়ালশ প্রকাশ করেছেন নিজের উচ্ছ্বাস। তিনি রসিকতা করে বলেছেন, ‘আমার মায়ের বয়সী জোয়ান কলিন্সকে এত হট আর গ্ল্যামারাস লাগছে যে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন!’
বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এই ট্রেন্ড অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে বিনোদন দুনিয়ায়। ৬০ বছর পার করা অভিনেত্রীরা আজকাল নিয়মিত আসছেন কানের আসরে বুক টান করে। ৬৩ বছর বয়সী ডেমি মুর এবার কানে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দামি সব ব্র্যান্ডের জামাকাপড় পরে। অন্যদিকে ‘এমিলি ইন প্যারিস’ খ্যাত ফিলিপাইন লেরয়-বিউলুও পরেছেন পপ তারকা বিয়ন্সের পছন্দের এক বেগুনি রঙের পোশাক।
চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ ডেবোরা জার্মিন মনে করেন, প্রবীণ নারীদের এমন সরব উপস্থিতি এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে। রেড কার্পেটের আসল উদ্দেশ্যই হলো ক্যামেরার সব স্পটলাইট নিজের দিকে টেনে নেওয়া। অতীতে এই বয়সী নারীদের এমন গ্ল্যামারাস রূপে খুব কমই দেখা যেত রাজকীয় এই মঞ্চে।
ফ্যাশন জগৎ চিরকালই তরুণদের নিয়ে মেতে থাকলেও, এখন সেখানেও জায়গা করে নিচ্ছেন প্রবীণরা। শ্যানেল, ব্যালেন্সিয়াগা আর লুই ভিটনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো তাদের ফ্যাশন শোতে রাখছেন ৪০ পার হওয়া মডেলদের। ৭৯ বছর বয়সী শিল্পী মিং স্মিথ ক্যাটওয়াকে হেঁটেছেন নামী ডিজাইনারের পোশাকে, আর ৮৮ বছর বয়সে ওপারে পাড়ি জমানো অভিনেত্রী ম্যাগি স্মিথও কাজ করে গেছেন নামী ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে।
মডেলিং এজেন্সির মালিক রেবি মেরিলিয়ন জানিয়েছেন বাজারে প্রবীণ মডেলদের বর্তমান চাহিদার কথা। নামী সব কোম্পানি এখন বুঝতে পেরেছে যে, বয়স্ক নারীদের পকেটের জোর অনেক বেশি এবং তারা সমাজে বেশ প্রভাবশালীও বটে। ক্রেতারাও এখন বিজ্ঞাপনে অবাস্তব পুতুলের চেয়ে এমন বাস্তবসম্মত মুখ দেখতেই বেশি পছন্দ করছেন।
ইউরোপের দেশগুলোতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতাও বাড়ছে বেশ দ্রুত। একটি সরকারি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ২০৭২ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষের বয়সই হবে ৬৫ বছরের বেশি। তাই কোম্পানিগুলো এখন থেকেই বয়স্ক ক্রেতাদের খুশি করতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে।
তবে এই চাকচিক্যের পেছনে এক বড় রহস্যের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন বিশ্লেষক অ্যালিসন ওয়ালশ। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘সমাজ আপনাকে বুড়ো হওয়ার অনুমতি দেবে ঠিকই, তবে শর্ত হলো আপনাকে দেখতে বুড়ো লাগা চলবে না এটাই হলো আসল খেলা!’
কানের মঞ্চে আলো ছড়ানো এই প্রবীণ নারীদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তারা সবাই শ্বেতাঙ্গ, স্লিম এবং শারীরিকভাবে একদম ফিট। ডেবোরা জার্মিন মনে করেন, পশ্চিমা সংস্কৃতির এক ছোট রূপই ফুটে ওঠে কানের রেড কার্পেটে। সমাজের মতো এখানেও বর্ণবৈচিত্র্য বা কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের সুযোগ এখনো কিছুটা কম।
তবে ভায়োলা ডেভিস বা অ্যাঞ্জেলা ব্যাসেটের মতো কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রীরা যেভাবে নিজেদের ক্যারিয়ার ধরে রেখেছেন, তাতে আগামী ১০ বছর পর তারাও এই মঞ্চ কাঁপাবেন বলে আশা করা যায়। বয়স হলেই সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে হবে এই পুরনো নিয়মকে ভেঙে দিয়ে প্রবীণ নারীরা কানের মঞ্চে এক নতুন ইতিহাস লিখছেন!
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান









