বিশ্ব ফ্যাশন এখন মডেস্ট পোশাকের দখলে

প্যারিসের মডেস্ট ফ্যাশন উইকে র্যাম্পে ফরাসি ব্র্যান্ড সুতোরার এর ক্রিস্টাল অলংকরণযুক্ত ক্রোশে বালাক্লাভা প্রদর্শিত হয়
প্যারিসের ঐতিহাসিক হোটেল লা মারোইসে গত মাসে বসেছিল মডেস্ট ফ্যাশন উইকের জমকালো আসর। সেখানে প্রভাবশালী ক্রেতা আর সাংবাদিকদের ভিড়ে মডেলরা র্যাম্পে হাঁটছিলেন সাটিন আর কারুকাজ করা সব শরীর ঢাকা সান্ধ্যকালীন পোশাক পরে।
আভিজাত্যের সেই হলে মডেলদের পরনে ছিল লম্বা ঝুলের ডেনিম আর মাথায় ছিল ক্রিস্টাল বসানো বালাক্লাভা টুপি।
ফরাসি ব্র্যান্ড সুতুরা মূলত নিকাব বা পর্দার এই আধুনিক রূপটি তুলে ধরেছে সেই শহরেই, যেখানে প্রকাশ্যে ধর্মীয় পোশাক পরা নিয়ে রয়েছে নানা নিষেধাজ্ঞা।
মুসলিম পোশাকের প্রতি ফ্রান্সের কঠোর মনোভাব থাকা সত্ত্বেও প্যারিসকে এই আয়োজনের জন্য বেছে নেওয়া ছিল বেশ সাহসী এক সিদ্ধান্ত। আয়োজক সংস্থা ‘থিংক ফ্যাশন’ এর সিইও ওজলেম শাহিন মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মডেস্ট ফ্যাশন এখন এক বিশাল শক্তিশালী মাধ্যম। প্যারিসের নামি সব জায়গায় এই আয়োজন প্রমাণ করে, পর্দার পোশাক এখন আর কোনো পিছিয়ে থাকা বিষয় নয়। বিশ্ব ফ্যাশনের বড় বড় মঞ্চে এখন মডেস্ট পোশাক রাজার হালে জায়গা করে নিচ্ছে।
গত ১০ বছরে এই মার্জিত পোশাকের বাজার অবিশ্বাস্যভাবে বদলে দিয়েছে কেনাকাটার ধরন। ২০২৮ সালের মধ্যে মুসলিমদের ফ্যাশন খাতে খরচ ৪৩৩ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে বলে আশা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। কারণ বড় বড় লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলো এখন বুঝতে পারছে, মুসলিম নারীরাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় আর দ্রুত বাড়ন্ত গ্রাহক। তাই সবাই এখন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এই মডেস্ট ফ্যাশনের বিশাল বাজারের ওপর।
আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের তিন ভাগের এক ভাগ মানুষই হবে মুসলিম, যাদের বয়স হবে পঁচিশের নিচে। এই বিশাল তরুণ প্রজন্মের পকেটের টান অনুভব করেই বড় বড় কোম্পানিগুলো এখন মুসলিম নারীদের পছন্দের দিকে মন দিচ্ছে।
২০১৪ সাল থেকেই ডিকেএনওয়াই বা টমি হিলফিগারের মতো ব্র্যান্ডগুলো রমজান মাস উপলক্ষে বিশেষ পোশাক বাজারে ছাড়তে শুরু করে। আগে এসব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের দোকানে মিললেও এখন তা পাওয়া যাচ্ছে সারা বিশ্বে।
মূলধারার ফ্যাশনেও এখন শরীর ঢাকা পোশাকের দাপট চোখে পড়ছে সবখানে। র্যাম্পে এখন ছোট পোশাকের বদলে লম্বা ঝুল আর হাই নেকলাইনের পোশাকই বেশি দেখা যাচ্ছে। নামি ডিজাইনার আলেসান্দ্রো মিশেলের হাত ধরে গুচি ব্র্যান্ডে ভিক্টোরিয়ান আমলের ঢিলেঢালা পোশাক এখন আধুনিক ফ্যাশন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ২০ এর দশকের শেষে এসে এই মার্জিত রুচির পোশাকই হয়ে উঠেছে ফ্যাশনের প্রধান ভাষা।
সোশ্যাল মিডিয়ার মুসলিম ইনফ্লুয়েন্সাররা এই মডেস্ট ফ্যাশনকে জনপ্রিয় করার পেছনে কাজ করেছেন সবচেয়ে বেশি। দিনা তোকিয়া বা আসিয়া আল-ফারাজের মতো হিজাবি তরুণীরা লন্ডন-মিলান ফ্যাশন উইকের প্রথম সারিতে বসে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাদের গুরুত্ব। বড় ব্র্যান্ডগুলো তাদের কদর বোঝার আগেই তারা অনলাইনে লাখ লাখ ভক্ত বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাদের হাত ধরেই মূলত পর্দা বা হিজাব এখন ফ্যাশনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবাই যখন শরীর প্রদর্শনকারী পোশাকের দিকে ঝুঁকছিল, ঠিক তখনই থিংক ফ্যাশন ছোট ছোট স্থানীয় ডিজাইনারদের জন্য এই মঞ্চ তৈরি করে দেয়। ইয়েমেনি তরুণী জুনাইনাহ মনে করেন, এই আয়োজনগুলো মুসলিম নারীদের মনে একধরনের সাহস আর আপন পরিচয়ের অনুভূতি জোগায়। মূলধারার ফ্যাশনে কেবল লোকদেখানো নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই এই ধরনের উদ্যোগ বড্ড জরুরি।
তবে পশ্চিমা দুনিয়ায় মডেস্ট ফ্যাশন নিয়ে একধরনের মানসিক লড়াইও চলছে সমানে। হিজাবি লেখিকা হুদা কাতেবি সুন্দর করে বলেছিলেন, পশ্চিমা কেউ গলা ঢাকা সোয়েটার পরলে সে হয় আধুনিক, আর আমি পরলে হই শোষিত। আল গুথমি মনে করেন, মডেস্ট ফ্যাশনের আসল শেকড় হলো মধ্যপ্রাচ্যে। তাই পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো যেন কেবল ব্যবসার লোভে এই ঐতিহ্যকে কেড়ে না নেয়, সেদিকে নজর রাখা দরকার।
বিদেশের নামি ব্র্যান্ডগুলো এখন মুসলিম ডিজাইনারদের সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরু করেছে ভুলবোঝাবুঝি এড়াতে। যেমন এমসিএম ব্র্যান্ডটি ২০২৪ সালে তাদের রমজান কালেকশন বানাতে হিজাবি তরুণী হানান হুয়াচমিকে সঙ্গে রেখেছে। আবার সব জায়গার মডেস্ট ফ্যাশন যে একই রকম হবে, এমন কোনো কথা নেই। ইউরোপের হালকা পোশাক আর আরবের জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকের ঢং একদমই আলাদা।
পুরো বিশ্বে এখন মডেস্ট ফ্যাশনের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে শহরভেদে। তুর্কিয়ে এখন এই ব্যবসার মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে তাদের বিশাল ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে। ইন্দোনেশিয়া আর মালয়েশিয়া আবার নিজেদের সৃজনশীলতার জোরে জয় করে নিচ্ছে সবার মন। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো গরমের কথা মাথায় রেখে বানিয়েছে দারুণ সব আরামদায়ক হিজাব আর পোশাক।
আরব দেশগুলোয় আবায়া এখন আর কেবল একটা সাধারণ বোরকা নয়, বরং এটি রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীক। সেখানে পোশাকের গায়ে দামি কারুকাজ আর জাঁকজমকই হলো আসল সৌন্দর্য। অন্যদিকে ইউরোপের মুসলিম নারীরা পছন্দ করেন হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক। এই বৈচিত্র্যই মডেস্ট ফ্যাশনকে বিশ্বের দরবারে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এক দশক আগেও এই খাতের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু রাবিয়া জারগারপুরের মতো মহিলারা এখন ডিজাইনার থেকে হয়ে উঠেছেন বড় বড় ব্যবসার পরামর্শক। তারা এখন সরকারকে বুদ্ধি দেন কীভাবে এই ফ্যাশন শিল্পকে বড় করা যায়। কর্মসংস্থানের এই নতুন দুয়ারে মুসলিম নারীদের জন্য তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার কাজ।
তবে কেবল সুন্দর পোশাক বানালেই হবে না, পরিবেশের দিকেও নজর দেওয়ার কথা বলছেন অনেকে। মারিয়া ইদ্রিসি, যিনি এইচএন্ডএমের প্রথম হিজাবি মডেল ছিলেন, তিনি মনে করেন, ফাস্ট ফ্যাশনের নামে অপচয় করা উচিত নয়। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো পরিমিত বোধ, তাই পোশাক তৈরির সময় শ্রমিকের অধিকার আর প্রকৃতির কথা মাথায় রাখাটাই হলো আসল মডেস্ট ফ্যাশন।
মডেস্ট ফ্যাশনের এই জয়জয়কারের সঙ্গে ‘কোয়াইট লাক্সারি’ বা সাধারণ সাজের বর্তমান ট্রেন্ডটি দারুণভাবে মিলে গেছে। বড় বড় লোগো আর জাঁকজমকের চেয়ে এখন গুণমান আর আভিজাত্যই মানুষের প্রথম পছন্দ। লন্ডনের ডিজাইনার ডেবোরা ল্যাটুচ প্রমাণ করেছেন, পুরো শরীর ঢেকেও যে কতটা আধুনিক আর অভিজাত লাগা যায়।
এখনকার মুসলিম নারীরা অনেক বেশি সচেতন এবং তারা ফ্যাশন জগতে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানেন। তারা আর এখন দয়ার পাত্রী হয়ে থাকতে চান না, বরং ফ্যাশন জগতের মূল আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন। মডেস্ট ফ্যাশন এখন আর কেবল একটি ধর্মীয় পোশাক নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে স্বাধীন এক জীবনযাত্রার নাম।
সূত্র: আলজাজিরা







