কীভাবে বলিউডের সেরা ভিলেন হয়ে উঠলেন ববি

ববি দেওল
নব্বইয়ের দশকে একঝাঁক ঝাঁকড়া চুল, মায়াবী চোখ আর রোমান্টিক হাসিতে তরুণীদের বুকে ঝড় তুলেছিলেন যে নায়ক, আজ থিয়েটারে তার এন্ট্রি হলে দর্শক ভয়ে সিট আঁকড়ে ধরে!
কথা বলছি ববি দেওলকে নিয়ে। বলিউডের একসময়ের এই চকোলেট বয় আজ হিন্দি সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সফল ও ভয়ঙ্কর ‘আলটিমেট ভিলেন’।
আগামীকাল বড় পর্দায় মুক্তি পাচ্ছে যশরাজ ফিল্মসের বহুল প্রতীক্ষিত স্পাই ইউনিভার্স সিনেমা ‘আলফা’। যেখানে আলিয়া ভাট এবং শর্বরী ওয়াঘের মতো দুই দুর্ধর্ষ নারী এজেন্টের মুখোমুখি দাঁড়াবেন ববি দেওল, ‘ফাতেহ সিং লাখাওয়াত’ নামক এক নিষ্ঠুর মেন্টর ও ভিলেনের চরিত্রে।
সিনেমাটি মুক্তির আগে চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে হিরো থেকে ভিলেন হয়ে ববি দেওলের ক্যারিয়ারের এই অবিশ্বাস্য ‘সেকেন্ড ইনিংস’ তৈরি হলো।
একটা সময় ছিল যখন ‘বারসাত’, ‘সোলজার’ কিংবা ‘হামরাজ’ দিয়ে ববি দেওল ছিলেন বলিউডের প্রথম সারির তারকা। কিন্তু ২০১০ সালের পর একের পর এক ফ্লপ ছবি ববিকে লাইমলাইটের বাইরে ঠেলে দেয়। লিড রোলের অফার আসা বন্ধ হয়ে যায়।
এক সাক্ষাৎকারে ববি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, সেই সময়ে তিনি চরম ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলেন এবং মদের নেশায় ডুবিয়ে দিয়েছিলেন নিজেকে। সবাই যখন ভেবেছিল ধর্মেন্দ্র-পুত্র ববির ক্যারিয়ার এখানেই শেষ, ঠিক তখনই ওটিটির হাত ধরে ঘটল এক অলৌকিক কামব্যাক!
ববির এই অবিশ্বাস্য দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু ২০২০ সালের ওটিটি সিরিজ ‘আশ্রম’ দিয়ে। শান্ত, ঠাণ্ডা মাথার ভণ্ড সাধু ‘বাবা নিরালা’র চরিত্রে ববি দেওল বুঝিয়ে দেন, চিৎকার বা মারামারি না করেও শুধু শান্ত চাহনি আর কুৎসিত মানসিকতা দিয়ে কতটা ভয়ঙ্কর ভিলেন হওয়া যায়।
এরপর ২০২৩ সালে সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গার ‘অ্যানিমেল’ সিনেমাটি ববির ক্যারিয়ারের পুরো ভূগোলই বদলে দেয়। ছবিতে ববির স্ক্রিন টাইম ছিল মাত্র ১০ থেকে ১২ মিনিট, একটিও সংলাপ ছিল না তার মুখে! কিন্তু সেই বোবা সাইকোপ্যাথ ‘আবরার হক’-এর চরিত্রে ববি যা দেখালেন, তা পুরো ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে দিল।
‘জামাল কুদু’ গানে মাথায় গ্লাস নিয়ে নাচার সেই দৃশ্য আজ পপ-কালচারের অংশ। ভক্তরা ভালোবেসে তাকে নাম দিলেন ‘লর্ড ববি’।
অ্যানিমেলেরও আগে ২০২২ সালের ‘লাভ হোস্টেল’ ছবিতে এক নিষ্ঠুুর হিটম্যান ‘দাগার’-এর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ববি। কোনো গ্ল্যামার ছাড়া, কম সংলাপে শুধু ঠান্ডা চোখের মারণ চাউনিতে তিনি যে আবহ তৈরি করেছিলেন, তা ববিকে বলিউডের অন্যতম আন্ডাররেটেড নেতিবাচক পারফর্মার হিসেবে প্রমাণ করে।
‘অ্যানিমেল’-এর সাফল্যের পর ববির চাহিদা শুধু বলিউডে সীমাবদ্ধ নেই। তামিল সিনেমা ‘কাঙ্গুভা’-তে সুরিয়ার বিপরীতে এবং তেলুগু ছবি ‘ডাকু মহারাজ’-এ নন্দামুরী বালকৃষ্ণের বিপরীতে প্রধান ভিলেন হিসেবে সাউথ কাঁপিয়েছেন তিনি।
এমনকি নেটফ্লিক্সের ‘দ্য ব্যাডস অব বলিউড’-এ এক অহংকারী সুপারস্টার অজয় তালওয়ারের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দেখিয়েছেন যে অ্যাকশন ছাড়াও সাইকোলজিক্যাল ভিলেন হিসেবে তিনি কতটা পারফেক্ট।
সাধারণত বলিউডের ভিলেন মানেই জোরে চিৎকার, চোখ বড় বড় করা বা অতিরিক্ত নাটকীয়তা। কিন্তু ববি দেওলের ম্যাজিক হলো তার ‘আত্মসংযম’। তার বিশাল চওড়া বডিবিল্ডারসুলভ চেহারাটাই মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য যথেষ্ট, তার ওপর ববি যখন পর্দায় একদম নিস্তব্ধ হয়ে যান, মুখে এক চিলতে অদ্ভুত হাসি নিয়ে তাকান, তখন সেই নীরবতাই থিয়েটারে আতঙ্ক তৈরি করার জন্য যথেষ্ট।
বাবা নিরালা, আবরার হক, দাগার কিংবা অজয় তালওয়ার—যে চরিত্রই হোক না কেন, ববি দেওলের অভিনয়ের ম্যাজিক হলো তিনি অতিরিক্ত নাটকীয়তা দেখান না। তার ভিলেনরা চিৎকার করে ভয় দেখায় না, তারা শান্ত থেকেই হয়ে ওঠে এক একটি জ্যান্ত বিপদ!
অথচ খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, বছরের পর বছর একের পর এক ফ্লপ ছবির পর ববি শুধু একটি ভালো সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। আর আজ বড় বড় পরিচালকেরা তাদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা গল্পগুলো তৈরি করছেন ববিকে ঘিরেই।
একেই হয়তো বলে জীবনের সবচেয়ে বড় টুইস্ট। যে অভিনেতা একসময় ‘হিরো’ হয়ে পর্দায় ভালোবাসার আলো ছড়িয়েছিলেন, তিনি আজ ‘ভিলেন’ হিসেবে অন্ধকারের পথ বেছে নিয়েই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আইকনিক ইনিংস খেলছেন।





