‘নয়নমনি’র ৫০ বছর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিল্প আর বাণিজ্যের মধ্যে থাকে যে অদৃশ্য দেয়াল তাকে কি ভাঙা সম্ভব? বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আজ থেকে ৫০ বছর আগে এই প্রশ্নের জবাব নিয়ে হাজির হয়েছিল ‘নয়নমনি’। দর্শক প্রেক্ষাগৃহে হুমড়ি খেয়ে দেখেছে, সমালোচকরাও একে শিল্পোত্তীর্ণ বলে রায় দিয়েছেন। মাস আর ক্লাসকে এক উঠানে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন আমজাদ হোসেন। সেই কাল্ট ক্ল্যাসিক ‘নয়নমনি’ মুক্তির ৫০ বছর পূরণ হলো আজ ২৫ জুন।
স্বাধীনতার পরপরই দেশে আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’র মতো শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র হলো, আবার জহিরুল হকের ‘রংবাজ’-এর মতো বাণিজ্যসফল সিনেমাও দেখল দর্শক। এ দুই ধারার মিলন যে সম্ভব প্রযোজক-পরিবেশক এ কে এম জাহাঙ্গীর খানও হয়তো সেটা ভাবেননি। তিনি শুধু খুঁজছিলেন এমন একজন নির্মাতা, যিনি তার পরিবেশক থেকে প্রযোজক হওয়ার যাত্রাটিকে সুগম করে দেবে। তিনি আমজাদ হোসেনের কাছে গিয়েছিলেন ‘সুজন সখী’র মতো একটা সম্ভাব্য দর্শকনন্দিত গল্পের সন্ধানে। খান আতার সিনেমা হলেও ‘সুজন সখী’র লেখক ছিলেন আমজাদ হোসেন। ফলে আলমগীর পিকচার্সের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো তাকে।
‘সুজন সখী’র অনুসরণে নামও রাখা হলো ‘নয়নমনি’। ‘সিনেমা’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘নিরক্ষর স্বর্গে’ নামে যে উপন্যাস থেকে ‘নয়নমনি’র চিত্রনাট্য তৈরি করা হলো, তার মধ্যেই একাধারে জীবনঘনিষ্ঠ ও বাণিজ্যসফল সিনেমা হওয়ার সমস্ত রসদ ছিল। ফলে সুপারহিট হয়েই ‘নয়নমনি’ থেমে যায়নি; এই সিনেমা আমাদের সমাজকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এবং জনতার ভাবনার জগৎকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
‘নয়নমনি’র আগে আমজাদ হোসেন ছিলেন একজন সমাজসচেতন সাহিত্যিক। ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’-এর চিত্রনাট্যকার হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার আগে নির্মাতা হিসেবে তিনি পূর্ণ শক্তি নিয়ে প্রকাশিত হতে পারেননি। ‘নয়নমনি’-তেই তিনি সার্থকভাবে স্বতন্ত্র শিল্পভঙ্গিমা নিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছেন। তার সঙ্গে সঙ্গে এই সিনেমার অভিনয়শিল্পীরাও নিজেদের পূর্ণমাত্রায় প্রস্ফুটিত করেছেন। কোনো একটি সিনেমার প্রধান চরিত্রগুলোর শিল্পীরা প্রত্যেকে প্রতিভার বারুদচ্ছটায় বিস্ফোরিত হতে পারেন এমনভাবে, তারও নজির ‘নয়নমনি’র আগে বিরল।
খলচরিত্রে এ টি এম শাসুজ্জামান কেবল বাজারের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন অভিনেতা হিসেবেই নিজেকে হাজির করেননি, অভূতপূর্ব অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মোড়ল চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ববিতা শুধু এই সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেই ভূষিত হননি, সর্বকালের অন্যতম সেরা বাঙালি অভিনেত্রী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। চলচ্চিত্রে নিজের চিরস্থায়ী আসন তৈরি করেছেন ফারুক। রওশন জামিল অভিনেত্রী হিসেবে এমন এক স্তরে নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন, যা অনতিক্রম্য ও দুর্লঙ্ঘনীয়। ফলে ‘নয়নমনি’ চলচ্চিত্রের বিদ্যার্থীদের জন্য হয়েছে অভিনয়ের এক মাস্টারক্লাস।
কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে নয়নমনি চিরায়ত চলচ্চিত্র হওয়ার কারণ এর বিষয় ও বক্তব্য। দ্রোহের সিনেমা, শোষণ, কূপমণ্ডূকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সিনেমা— এ রকম নানা অভিধায় এই সিনেমাকে ভূষিত করেছেন চলচ্চিত্র সমালোচকরা। তবে মূলত আবহমান বাংলার এক সিনেমা ‘নয়নমনি’। এই ভূখণ্ডের গল্প কেমন হওয়া উচিত, নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষের অঞ্চলের নির্মাতার বয়ান কেমন হওয়া উচিত, তার একটা নজরকাড়া নির্দেশনা পাওয়া যায় ‘নয়নমনি’তে। ঝলমলে রুপালি পর্দায় কীভাবে মাটি ও মানুষের জীবনযুদ্ধ উঠে আসতে পারে, ৫০ বছর ধরে তারই এক জ্বলজ্বলে দলিল হয়ে আছে এই সিনেমা।




