উপাচার্য পদে আসছেন শিক্ষা দরদীরা
দল বিবেচনার বাইরেও থাকতে হবে ৩ যোগ্যতা

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
তোতা কাহিনীতে রাজা চেয়েছিলেন এক পাখিকে জ্ঞানী করতে। সিলেবাস হলো, তৈরি হলো স্কুল। কিন্তু শেষে দেখা গেল তোতার প্রাণ যায় যায়। গলায় গান নেই আছে শুধু বই আর খাঁচা। উচ্চশিক্ষার হালটাও ঠিক একই রকম। ভবন আছে, নীতি নির্দেশিকারও অভাব নেই। কিন্তু হারিয়ে গেছে শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, শিক্ষক-গবেষকের কৌতূহল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির আখড়া। শিক্ষা-রাজনীতি ছাত্রদের কাঁচা হাতের ছেলেখেলায় আর নেই। এটা এখন রাজনীতিকদের পাঞ্জা লড়ার জায়গা।
নতুন সরকার আলগা হয়ে যাওয়া শিক্ষার সেই বাঁধুনি শক্ত করতে চাচ্ছে। দলীয় আদর্শের হলেই উপাচার্যের চেয়ারে বসবেন, এমনটা থেকে সরে এসেছে। এরসঙ্গে আরও তিন যোগ্যতা পাখির চোখে যাচাই করা হবে।
উপাচার্য নিয়োগের অন্যতম শর্তই হবে পিএইচডি ডিগ্রি। যিনি যত ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করবেন, নিয়োগে ততোটাই এগিয়ে থাকবেন। গবেষণার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জার্নালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণা নিবন্ধ থাকতে হবে। অভিজ্ঞতা লাগবে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ বছর শিক্ষকতার। অগ্রাধিকার একাডেমিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা, ছাত্রকল্যাণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞদের। এছাড়া বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনায় আসবে।
নতুন নীতিমালায় দলীয় বিবেচনাকেও বাদ দেওয়া হবে না। যোগ্যদের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় শিক্ষক সংগঠনে কাজ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দলের প্রতি অনুগত তাদেরকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। তবে অতীতে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও চৌর্যবৃত্তির সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে তাদের বিবেচনা করা হবে না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে পরিবর্তন আসতে পারে। যার শুরুটা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে। তবে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী ও বিভিন্ন মাপকাঠিতে যোগ্যদের রেখে দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা মন্ত্রণালয়ে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়ে বিভিন্ন স্তরে তদবিরে ব্যস্ত। আপাতত এসব বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না বলে তিনি জানান ।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন রক্তশূন্য। শতশত শিক্ষক পদ খালি, প্রশাসনিক পদের তো আরো করুণ দশা। যথাযথ নেতৃত্বের অভাবে জ্ঞানের মুক্ত হাওয়া ক্রমে ফুরিয়ে আসছে। একদিনে এ অবস্থা হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই জটিলতা। উপাচার্য হওয়ার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা মাপকাঠির সুনির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক নেই। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে পরিচালিত হয় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে আইনের বিধান অনুযায়ী উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। যদিও এটি মানা হয় না। আর অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের কোনো মানদণ্ডই নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি উপাচার্য নিয়োগ দিলেও মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা পাঠানোর পর প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে তা চূড়ান্ত হয়। এক্ষেত্রে দশকের পর দশক ধরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনাকেই একমাত্র যোগ্যতা বিবেচনা হয়।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এ ধরনের নীতিমালা ও যোগ্যতার আলোকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং একাডেমিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখন যদি নির্ধারিত যোগ্যতার মাপকাঠি কঠোরভাবে অনুসরণ হয়, তাহলে দলীয় বিবেচনায় হলেও অন্তত যোগ্য ও সক্ষমরাই দায়িত্বে আসবেন। কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত থাকতেই পারে; তবে সেটিই যেন একমাত্র যোগ্যতা না হয়। দলীয় পরিচয় থাকলেও যদি একাডেমিকভাবে শক্তিশালী, গবেষণায় স্বীকৃত এবং প্রশাসনিকভাবে দক্ষ হন তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় সামগ্রিকভাবে উপকৃত হবে। এতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থিতিশীলতা বাড়বে, গবেষণার মান উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ থাকবে সুরক্ষিত।
উপাচার্য পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়, একাডেমিক নেতৃত্বেরও জায়গাÑ মনে করেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মো. ফারুক আহমেদ। ‘তাই এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একাডেমিক সক্ষমতা, গবেষণায় অবদান এবং নৈতিক অবস্থান। দলীয় পটভূমি থাকতেই পারে, কিন্তু সেটি যেন যোগ্যতার বিকল্প না হয়। যদি এ ধরনের মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চশিক্ষা ডেস্কের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, আস্তে-ধীরে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হবে। চলতি মাসের যেকোনো সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে তা শুরু হতে পারে।
উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে যোগ্যদের সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রয়োজনের কথা তুলে ধরলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। ‘মন্ত্রণালয় বা কমিশনের অধীনে একটি সার্চ কমিটি উপাচার্য উপযোগী শিক্ষক বাছাই করবে। সেখান থেকে সৎ ও যোগ্যদের উপাচার্য হিসেবে বেছে নেওয়া হবে। সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে কখনও যোগ্য উপাচার্য পাওয়া যাবে না। কারণ, নির্বাচন করতে গেলেই নানা সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তাকে ভোটে জিতে আসতে হবে। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানে কম্প্রোমাইজ করতে হবে প্রার্থীকে।’

