স্মৃতি হচ্ছে হ্যারিংটন ভবন, নষ্টালজিক নটরডেমিয়ানরা

ছবি: আগামীর সময়
এখানে জমে আছে অসংখ্য হাসি, বন্ধুত্ব, দুষ্টুমি, স্বপ্ন, অপেক্ষা আর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কিছু দিনের গল্প। কত শত পায়ের ছাপ, কত বন্ধুত্ব, কত স্বপ্ন আর কত না বলা গল্প জমে আছে!
ঢাকার নটর ডেম কলেজের ফেসবুক পেজে এখন ঝুলছে এই পোস্ট। কারণ মুছে যাবে একটি ভবনের চিহ্ন; আর তা নিয়ে স্মৃতিকাতর এখন এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা।
তিন তলা এই ভবনটি ফাদার হ্যারিংটন ভবন। পুরান ঢাকা থেকে ১৯৫৪ সালে আরামবাগে ক্যাম্পাস স্থানান্তরের সময় এই ভবন দিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল নটর ডেম কলেজের। ৭০ বছর পেরিয়ে আসা এই ভবন এখন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
নতুন ভবন উঠবে সেখানে। চেনা দৃশ্য যাবে হারিয়ে। তাই পুরনো শিক্ষার্থীদের শেষ বারের মতো ভবনটি দেখার সুযোগ দিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকে যাচ্ছেন ক্যাম্পাসে, খুঁজে ফিরছেন ফেলে আসা স্মৃৃতি।
বৃহস্পতিবার হ্যারিংটন ভবন ঘিরে স্মৃতিকাতরতার এক আবেগঘন আবহ দেখা গেল কলেজটিতে গিয়ে। ভবনটির সামনে, শ্রেণি কক্ষে, ছাদে ঘুরছিলেন কেউ, স্মৃতির ভবনকে কেউ বন্দি করছিলেন নিজের মোবাইলে ক্যামেরায়।
কেউ কেউ দেয়ালে লিখছিলেন তাদের রোল নম্বর, এটা জেনেই যে ভবন ভেঙে ফেললে এই লেখাটিও হারিয়ে যাবে। নটর ডেম কলেজের সব শিক্ষার্থীদের রোল নম্বর আলাদা, যা তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেউ হাত বুলিয়ে নিচ্ছিলেন পুরনো ক্লাসরুমের দরজায়, কেউবা দাঁড়িয়ে দেখছিলেন সেই করিডোর, যেখানে একসময় কেটেছে তাদের সোনালী কৈশোর।
নব্বইয়ের দশকের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সদ্য পাস করা নটরডেমিয়ান, সবার উপস্থিতি দেখা গেল তাদের স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকা ভবনটির সামনে।
সেই ভিড়ে ছিলেন ডা. এম সামিউল হক, তিনি ১৯৯৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী। পরিবার নিয়ে এসেছিলেন নিজের স্মৃতিবিজড়িত ভবনটি শেষবার দেখতে।
সামিউল বললেন, ‘যখন প্রথমে শুনলাম যে ভবনটি ভাঙা হবে, তখনই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এত এত স্মৃতি এই ভবন এবং কলেজের সাথে, তা বলে শেষ করা যাবে না।’
এই ভবন নিয়ে নানা স্মৃতি জড়িয়ে থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় শুধু ভবনের সামনের মাঠ, বাস্কেটবল গ্রাউন্ড এবং এই ভবনটি ছিল। তাই আমাদের এই ভবনের সাথে বেশি স্মৃতি জড়িত। ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই চলে যেতাম মাঠে, সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলাধুলা করে পরে যেতাম বাসায়।’
পাশের বারান্দায় দলবেঁধে ছবি তুলছিলেন ২০২২ ব্যাচের দুই বন্ধু মুহতাসিম আমিন ও আহনাফ সামি।
মুহতাসিম বললেন, ‘আমার কলেজ জীবনে শেষ ক্লাসের দিনের কথা সারাজীবন মনে থাকবে। সেদিন ক্লাসে বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমাদের ম্যাথের শিক্ষক অনেক কিছু পড়ানোর পর বলেছিলো আজকেই তোমাদের শেষ ক্লাস। সেই মুহূর্তে আমার প্রিয় স্যারের মুখ থেকে এটা শোনা আমার জন্য প্রচণ্ড মন খারাপের ছিল। সেই দিনে এই রুমেই ক্লাস করেছিলাম।’
ভবনটির সঙ্গে নিজের স্মৃতি তুলে ধরে আহনাফ সামি বলেন, ‘আমার কলেজের অনেকগুলো সেরা মুহূর্তের মধ্যে একটা মুহূর্ত মনে আছে। আমি ৩০৯ এ একটা কুইজ দিচ্ছিলাম। কেমিস্ট্রির সাপ্তাহিক কুইজ ছিলো সুশান স্যারের। সেদিন অনেক খারাপ হয়েছিলো কুইজ পরীক্ষাটা। আমি পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে সোজা মাঠের সামনে বসেছিলাম। তখন আমাদের ছাত্র পরিচালক এসেই আমাদের আইডি কার্ড নিয়ে গেল কিছু শোনার আগেই। তখন সেই কার্ড নিতে পেরেছি তার পরের দিন। যে স্মৃতি আমার সারাজীবন মনে থাকবে।’
অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আবার আসার পরিকল্পনা রয়েছে বলে মুহতাসিমের। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের কোরাম অনেক বড় ছিল। সবাই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে, হয়তো আগামী এক তারিখের আগে আবার আসার একটা পরিকল্পনা করতে পারি।’
২০২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী রাফিদ হাসান বললেন, ‘একবার ফিজিক্স প্র্যাক্টিকাল দেওয়ার সময় স্যারের কাছে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার পর স্যারের মুড খারাপ থাকার কারণে তিনি আমার পুরো খাতাই ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। পরে আমার আইডি কার্ড ও নিয়েছিলেন। এটাই আমার সবচেয়ে ভাল এবং সবচেয়ে খারাপ স্মৃতি।’
কয়েক দশক ধরে হাজার তরুণের স্বপ্নের বুনন যে স্থানটি ঘিরে, সেই হ্যারিংটন ভবন আর থাকবে না। তা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ঝরছে সাবেক এই শিক্ষার্থীদের মনে। তারা ভাবছেন, ভেঙে যাবে দেয়াল, মুছে যাবে পরিচিত করিডোর। কিন্তু এর দেয়ালের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো কি কখনো ভেঙে ফেলা যায়?







